রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া যৌনপল্লিতে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বহু নারী আর পেশায় কার্যকর থাকা সম্ভব না হওয়ায় দারিদ্র্য ও অবহেলায় পড়ে যাচ্ছেন। পল্লিতে প্রায় দেড় হাজার যৌনকর্মী রয়েছেন এবং এখানে শিশু সন্তান রয়েছে প্রায় ৬০০ জন। বয়স্ক কর্মীরা অনেকেই এখন ভিক্ষাবৃত্তি করে দিন যাপন করছেন; কিছু ক্ষেত্রে ঋণের চাপের সঙ্গে সন্তান বিক্রির কথােও সংগঠিত তথ্যে উল্লেখ আছে।

স্থানীয় সমাজকর্মী ও সংস্থাগুলো মাঝে মাঝে ত্রাণ ও স্বাস্থ্যসেবা দিলেও প্রয়োজনের তুলনায় সহায়তা অপ্রতুল; ফলে ‘রঙিন’ জীবনের সমাপ্তি অনেকের জন্য মর্মান্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জীবিকার সংকট ও পারিবারিক পরিস্থিতি

বয়স্ক যৌনকর্মীরা জানান যে খদ্দের না থাকায় আয় বন্ধ হয়ে গেছে, সঞ্চয় না থাকা ও ঋণের চাপ বৃদ্ধিতে তাদের অনেকেই ভিক্ষা করতে বাধ্য। একাধিক নারী বলেছেন যে পূর্বে আয় করলেও অর্থ নিয়ন্ত্রণ অন্যদের হাতে চলে গেছে; ফলে কোনো আয় না থাকলে সন্তানের খাওয়া-দাওয়া ও ওষুধ জোগাড়া করা কঠিন হয়ে পড়ে।

“আমাদের জীবনটাই এমন। একটা সময় রঙিন হয়তো, শেষ সময় ভিক্ষার ঝুলি। আমার সমবয়সী যারা ছিল তাদের সবার আমার মতো অবস্থা হয়েছে।”

অন্য এক কর্মী বলছেন যে গর্ভধারণের পর তিন মাসে খদ্দের চলে গেলে খাবারের ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে তাঁরা ঋণ নেন এবং শেষে অনেকে সন্তান বিক্রির মতো চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। পল্লিতে বসবাসকারী সূত্র বলছে, এখানে অবসরপ্রাপ্ত যৌনকর্মী প্রায় ২০০ জন এবং মায়েদের হাত ধরে পেশায় থাকা প্রায় ৩৫০ জন নারী আছে; ১৮ বছরের নিচে শিশু যৌনকর্মীর সংখ্যা প্রায় ২০ জন। পল্লিতে ২৮০টি বাড়ি এবং শিশুসন্তান রয়েছে প্রায় ৬০০ জন।

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও এনজিও কাজ

একজন ৩৭ বছরের নারীর এইচআইভি পজিটিভ ধরা পড়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। ওই নারীর চিকিৎসা সরকারি কলেজ হাসপাতাল ও বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত হলেও তিনি ঢাকায় আর যেতে চান না এবং বাইরে গোপনে খদ্দেরদের সঙ্গে মেলামেশা চালিয়ে যাচ্ছেন—এটি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে সমাজকর্মীরা জানাচ্ছেন।

দৌলতদিয়ায় পল্লির নারী ও শিশুদের জন্য কাজ করছে কয়েকটি সামাজিক ও মানবিক সংগঠন:

  • পায়াক্ট বাংলাদেশ
  • কর্মজীবী কল্যাণ সংস্থা, গণস্বাস্থ্য
  • শাপলা, মুক্তি মহিলা সমিতি
  • অসহায় মহিলা ও শিশু উন্নয়ন সংস্থা, অসহায় নারী ঐক্য সংগঠন, হাব বাংলাদেশ

এসব সংস্থা বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, সেফ হোমে থাকার ব্যবস্থা ও শিক্ষাসংক্রান্ত সহায়তা দিচ্ছে; তবু সহায়তা পর্যাপ্ত নয় বলে তারা জানায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন এবং পল্লির সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

শিশুদের ভবিষ্যত ও সমাধান দাবি

সামাজিক কর্মীরা বলছেন শিশুদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, নিরাপদ আবাসন ও শিক্ষার ব্যবস্থা না হলে তারা মায়ের পেশায় বা মাদক ও অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। সেফ হোম থেকে কিছু শিশু প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে সফলতা পেয়েছে—কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগে পড়ছে, কেউ কোরআনে হাফেজ হয়ে উচ্চতর শিক্ষায় নিয়োজিত।

বাস্তবে বয়স্ক যৌনকর্মীদের জীবনযাপন ও শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি মেলবন্ধনে কার্যকর সহায়তা প্রয়োজন—এমনই চাহিদা পল্লির বাসিন্দারা উত্থাপন করেছেন।