বাংলাদেশে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচন ব্যবস্থা চালুর দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে সাতটি ইসলামি দল। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামী ফেব্রুয়ারিতে এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণের কথা ঘোষণা করেছেন এবং নির্বাচন কমিশনও সেই সময়ে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ইসলামি দলগুলো পিআর-সহ পাঁচ দফা দাবিতে রাজধানী থেকে শুরু করে সারা দেশে কর্মসূচি পালন করছে। তবে এই দাবি নিয়ে দলগুলো কতদূর এগোতে পারবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সংশয় দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর থেকে দেশে কোনো জাতীয় নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়নি। ইসলামি দলগুলোর বাইরে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অবস্থান এই বিষয়ে ভিন্ন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং গণ অধিকার পরিষদের কিছু নেতা সংসদের উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিকে সমর্থন করলেও, নিম্নকক্ষে এর বিপক্ষে মত দিয়েছেন। তবে এই দুটি দল এখনো পর্যন্ত পিআর পদ্ধতি নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায়নি। অন্যদিকে, দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি (বিএনপি) শুরু থেকেই পিআর ব্যবস্থার বিরোধিতা করে আসছে। তাদের মতে, এটি আসলে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার একটি ষড়যন্ত্র মাত্র। বিএনপির নেতারা আরও বলছেন যে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় পিআর চালু করা সম্ভব নয় এবং এটি জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের পথে নতুন জটিলতা সৃষ্টি করবে। পিআর পদ্ধতির পক্ষে ইসলামি দলগুলোর যুক্তি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং খেলাফত মজলিসসহ যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে একই ধারায় চলছে, অথচ বিশ্বের অনেক দেশে নতুন ও আধুনিক পদ্ধতি চালু হয়েছে। তারা মনে করেন, অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যকর প্রমাণিত হওয়ায় জনগণের আস্থা তৈরি হয়েছিল এবং সেই সময়ে নির্বাচন তুলনামূলক শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পিআর সিস্টেমকে ফ্যাসিবাদ ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে তারা দাবি করছেন। এই দলগুলোর নেতারা আরও উল্লেখ করেছেন যে, সংস্কার বা জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি না হলে নির্বাচনের পরে তা বাস্তবায়ন হবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার না থাকায় অতীতে নানা রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল বলেও তারা মনে করেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেছেন, ‘নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। ইসলামি দলগুলোর বাইরে অন্য দলের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। কর্মসূচিতে না আসলেও তাদের সঙ্গে আলাপ চলছে আমাদের। অন্যান্য দল জুলাই সনদ ও উচ্চকক্ষে পিআর-এর বিষয়ে এক। তারাও তাদের দলের মধ্যে আলোচনা করছে। এসব ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে আমাদের চিন্তার ঐক্য আছে, কর্মসূচির ঐক্য এখনো হয়নি।’ মাওলানা আব্দুল হালিম আরও জানান, সব দল একভাবে পিআর সিস্টেম চাইছে না, তবে অধিকাংশের অবস্থান এক। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার আনা জরুরি। কিছু দল আন্দোলনে নামতে দেরি করলেও, তারা তাদের দাবি থেকে সরে আসেনি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনূস আহমেদ বলেছেন, তারা ৫ আগস্টের পর থেকে পিআর দাবি জানিয়ে আসছেন এবং এটিকে জনগণের দাবি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, ২৬ সেপ্টেম্বর উপজেলা পর্যায়ের আন্দোলন শেষে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে এবং পিআরসহ পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলনকারীরা সবাই একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেবেন। বিভিন্ন দলের ভিন্নমত ও বিশেষজ্ঞের পর্যবেক্ষণ পিআর দাবি ও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তিকে সামনে রেখে ইসলামি দলগুলো আন্দোলন করলেও, কওমি ঘরানার কয়েকটি দলের মধ্যে সংসদের নিম্নকক্ষে পিআর দাবির বিষয়ে মতানৈক্য রয়েছে।