বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং সরকারের প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলোকে একপেশে, জবরদস্তিমূলক ও জাতির সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে আখ্যায়িত করেছেন। দীর্ঘ এক বছরের আলোচনার পরও এই প্রস্তাবগুলো অর্থহীন ও প্রহসনমূলক করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। গুলশানে চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সরকারের প্রস্তাবিত বাস্তবায়ন আদেশকে গণতন্ত্র, সংসদীয় সার্বভৌমত্ব ও আইনের শাসনের পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’–এর চূড়ান্ত কপিতে কিছু দফায় অগোচরে সংশোধন আনা হয়েছে। তার অভিযোগ, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরকারি-বেসরকারি অফিসে টানানোর বিধান বিলুপ্তির বিষয়ে প্রায় সব দল একমত হলেও তা সনদে রাখা হয়নি। একইভাবে, সংবিধানের ১৫০(২) অনুচ্ছেদের (পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম তফসিল) বিলুপ্তির প্রস্তাবও বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে সনদের অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করা হলেও, চূড়ান্ত কপি তাদের সামনে আনা হয়নি।
সরকারের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন
বিএনপি মহাসচিব সরকারের ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ জারির উদ্যোগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, এই আদেশ জারি করার এখতিয়ার সরকারের নেই। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুসারে ‘আদেশ’ আইনের মর্যাদাসম্পন্ন; এটি জারি করা কেবল রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার। সরকার এভাবে আদেশ জারি করলে তা অসাংবিধানিক হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গণভোট প্রস্তাব ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ
ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে ৪৮টি দফা গণভোটে তোলার প্রস্তাবের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত ও ‘নোট অব ডিসেন্ট’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তার মতে, এক বছরের আলোচনার সব প্রচেষ্টা অর্থহীন ছিল এবং এটি জাতির সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রস্তাব নিয়েও মির্জা ফখরুল প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে কাজ করবেন—এমন প্রস্তাব নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতার বাইরে। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা শুধু জাতীয় সংসদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পর্যন্ত সীমিত। তিনি আরও বলেন, এ পরিষদ যদি ২৭০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ না করে, তাহলে সংস্কার বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে—এমন ধারণা হাস্যকর ও গণতান্ত্রিক রীতির পরিপন্থী।
নির্বাচনের দিন গণভোটের প্রস্তাব
আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি একটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে—নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজন করা হোক। মির্জা ফখরুল বলেন, আগে গণভোট নেওয়া অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক ও অবিবেচনাপ্রসূত। তিনি যুক্তি দেন যে, নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হলে সময়, ব্যয় ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার দিক থেকে তা যুক্তিযুক্ত হবে।
বিএনপির ছাড় ও জাতীয় ঐক্যের আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি সংস্কার কমিশন ও ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে বহু ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিএনপি সবসময়ই সংস্কারের পক্ষে। শহীদ জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার ভিশন–২০৩০ এবং তারেক রহমানের ২৭ দফাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলো প্রমাণ করে বিএনপি গণতান্ত্রিক সংস্কারে আন্তরিক। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের রক্তের অঙ্গীকার রক্ষায় জাতি ঐক্যবদ্ধ হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা। বিএনপি মহাসচিব বলেন, জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে তারা এমন এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে চান, যেখানে থাকবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার। তিনি সতর্ক করে দেন যে, জাতিকে বিভক্ত করার যেকোনো পদক্ষেপ অনৈক্য সৃষ্টি করবে এবং জাতীয় জীবনে অকল্যাণ ডেকে আনবে। তিনি বলেন,
“আমরা চাই ঐক্য, প্রতারণা নয়।”