বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন যে, বর্তমান সরকারের মেয়াদে প্রশাসনে যদি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা থাকেন, তবে তাদের পদে রাখা যাবে না। তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল ধারণা হলো নির্দলীয়তা এবং নিরপেক্ষতা। একটি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের উপদেষ্টা বা দলীয় পরিচয়ের ব্যক্তিদের প্রশাসনে থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না, যা একটি সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য অপরিহার্য। বুধবার (২২ অক্টোবর) নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন।

প্রশাসনে দলীয়করণ ও অবাধ নির্বাচন

রিজভী আরও উল্লেখ করেন যে, গত পনেরো বছরে যারা বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে জড়িত ছিলেন এবং যারা ফ্যাসিবাদী শক্তিকে রক্ষা করতে গিয়ে বেআইনি কার্যকলাপে অংশ নিয়েছেন, তাদের প্রশাসনে রেখে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তিনি দাবি করেন যে, এই ব্যক্তিরা তাদের দলীয় আনুগত্য ও অবৈধ কার্যক্রম গোপনে করেননি, বরং অনেকেই প্রকাশ্যে সরকারের প্রতি সহযোগিতা করেছেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তাই, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা অপরিহার্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, যখন একটি অন্তর্বর্তী সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপ নেবে, তখন তাকে অবশ্যই সম্পূর্ণ নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ হতে হবে। এর মাধ্যমে গত ষোলো বছর ধরে যারা ভোটের ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়েছেন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে সেই আস্থা ও বিশ্বাস ফিরে আসবে বলে তিনি মনে করেন। বিএনপির পক্ষ থেকে দলীয় লোক অপসারণ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দাবি জানানো হয়েছে, যা একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত।

আইনি প্রক্রিয়া ও সেনা কর্মকর্তাদের গ্রেফতার

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দুটি মামলায় সাবেক ও বর্তমান পনেরো জন সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ প্রসঙ্গে রুহুল কবির রিজভী বলেন, এসব বিষয় সম্পূর্ণভাবে আইনি প্রক্রিয়ার আওতাধীন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, আইনি প্রক্রিয়ায় যা হওয়ার তা-ই হবে এবং যারা অপরাধী, তাদের বিচার হওয়া উচিত। তবে, এই সমগ্র প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো হস্তক্ষেপ থাকা উচিত নয়, যাতে বিচার প্রক্রিয়া তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারে। রিজভী আরও বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার সুযোগ দেওয়া হবে। যদি আদালত প্রমাণ করে যে তারা অভিযুক্ত, তাহলে তাদের আদালতের নির্ধারিত শাস্তি ভোগ করতে হবে, কারণ আইনের চোখে সবাই সমান এবং কোনো ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ও বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

তিনি দাবি করেন যে, দেশের সবক্ষেত্রে চরমভাবে দলীয়করণ হয়েছে, যা প্রশাসনের কার্যকারিতা এবং নিরপেক্ষতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। রিজভী অভিযোগ করেন, প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তাকে দেশে থাকতে না পেরে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে, যা দেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। তিনি মন্তব্য করেন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হয়তো ভেবেছিলেন তাদের ‘জমিদারি’ সারাজীবন থাকবে, কিন্তু ৫ আগস্টের পর অনেকের মানসিকতা পরিবর্তিত হয়েছে, তবুও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। তিনি আরও জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন যে, বিএনপি যদি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসে, তবে পঁচিশ কোটি বৃক্ষরোপণ করা হবে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পরিশেষে, তিনি আবারও বলেন যে, বর্তমান সরকারে যদি কোনো দলীয় ব্যক্তি থাকেন, তবে তাদের অবিলম্বে সরিয়ে দিতে হবে, অন্যথায় একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।