বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের চলমান আন্দোলনে সরকারের উদাসীনতাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের শিক্ষা আজ জাতির মেরুদণ্ড নয়, বরং জাতির অসুস্থতা হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে, যা সরকার ও প্রশাসনের উদাসীনতা দেখলে স্পষ্ট হয়।
সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সরকার প্রতিশ্রুত স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সচল সব নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে অবস্থানরত শিক্ষকদের প্রতি সংহতি জানাতে এসে তিনি এসব কথা বলেন। রিজভী বলেন, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষিত শিক্ষকরা আজ ফুটপাতে বসে অনশন করছেন, অথচ সরকার বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি আরও দাবি করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই শিক্ষকরা আজ অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। তার মতে, এটি কেবল সরকারের লজ্জা নয়, সমগ্র জাতির জন্য লজ্জার বিষয়।
শিক্ষকদের দুর্দশা ও সরকারের দায়বদ্ধতা
রুহুল কবীর রিজভী বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকরা, যারা জাতি গঠনের কারিগর, তারা তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে রাজপথে নেমে এসেছেন। বছরের পর বছর ধরে তারা এমপিওভুক্তির দাবি জানিয়ে আসছেন, কিন্তু তাদের সমস্যার কোনো সমাধান হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি সরকারের চরম উদাসীনতারই প্রতিফলন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে যাচ্ছে এবং শত শত কোটি টাকা কিছু ব্যক্তির বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেখানে শিক্ষকদের জন্য অর্থ বরাদ্দ করতে সরকারের অসুবিধা কোথায়?
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে সব রাজনৈতিক দল সমর্থন দিয়েছিল এই বিশ্বাসে যে, এর অধীনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব হবে। ড. ইউনূসের প্রতি সেই বিশ্বাস এখনো অটুট থাকলেও, সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টারা জনগণের স্বার্থে এবং জনগণের চিন্তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করছেন না বলে রিজভী অভিযোগ করেন। তিনি মনে করেন, এটি কোনো কার্যকর সরকারের কাজের অংশ হতে পারে না।
অর্থনৈতিক নীতি ও জনস্বার্থ
রিজভী পূর্ববর্তী সরকারের আমলে ভারতের একটি বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে হওয়া বিদ্যুৎচুক্তির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, এই ধরনের চুক্তি পৃথিবীর আর কোথাও হয়নি, যেখানে বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও বেসরকারি কোম্পানিকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, অথচ নন-এমপিও শিক্ষকদের জন্য সরকারের কাছে কোনো টাকাই নেই এবং তাদের জন্য কোনো নীতিমালাও তৈরি হয় না।
তিনি অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির সমালোচনা করে বলেন যে, তিনি কখনো গরিব মানুষের পক্ষে ছিলেন না। রিজভী অভিযোগ করেন, সরকার গরিব মানুষের জন্য হলেও এই সরকার গরিব মানুষের দিকে তাকায় না, বরং গরিব মানুষের ওপর কীভাবে স্টিমরোলার চালানো যায়, তার নমুনা দেখা যাচ্ছে। তিনি কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের ওপর ৮৩ শতাংশ কর বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, এতে সারের দাম বাড়বে এবং কৃষকরা বিপর্যস্ত হবেন, যা প্রমাণ করে সরকার গরিববান্ধব নয়।
শিক্ষাব্যবস্থায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
বিএনপির এই নেতা আরও উল্লেখ করেন যে, আমলাতান্ত্রিক লালফিতার জটিলতা শিক্ষা খাতকে জর্জরিত করে রেখেছে। তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে বেসরকারি শিক্ষকরাও ভালো বেতন পান, কিন্তু বাংলাদেশে নন-এমপিও শিক্ষকরা বছরের পর বছর ধরে দাবি জানিয়ে এলেও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না।
রিজভী অবিলম্বে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্ত করার দাবি জানান এবং শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শিক্ষকরা মানুষ গড়েন, অথচ তারাই অনাহারে অনশন করছেন—এটি জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর একটি পরিস্থিতি।