দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় ‘জাতীয় জনজাতি জোট’র আত্মপ্রকাশ

ঢাকা শহরের সেগুনবাগিচায় অবস্থিত ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির ক্র্যাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশ ও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দলিত, হরিজন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের মৌলিক অধিকার আদায়ের উদ্দেশ্যে এনসিপি-র সহযোগী সংগঠন হিসেবে ‘জাতীয় জনজাতি জোট’ আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের আত্মপ্রকাশ করেছে। অবহেলিত ও নিপীড়িত মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, আইনি এবং অর্থনৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক মঞ্চ গঠিত হয়। উদ্বোধনী সমাবেশে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আগত বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, তরুণ সমাজকর্মী ও মানবাধিকার সচেতন নাগরিকগণ অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন।

১১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা ও পরিচিতি

সংগঠনের উদ্বোধনী সম্মেলনে রাজনৈতিক অঙ্গনের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে এক নতুন যাত্রার সূচনা হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত এনসিপি-র সদস্যসচিব আখতার হোসেন ১১ সদস্যবিশিষ্ট একটি আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেন। এই কেন্দ্রীয় কমিটিতে এনসিপি-র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ভীম্পাল্লী ডেভিড রাজুকে আহ্বায়ক এবং দলের অপর যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক কৈলাশ চন্দ্র রবিদাসকে সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

এছাড়া এই কমিটিতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রাজেন্দ্র কুমার দাস, যুগ্ম আহ্বায়ক মানিক বড়াইল, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব অরুনা রানী দাস এবং যুগ্ম সদস্যসচিব হিসেবে নিপু দাস মনোনীত হয়েছেন। সংগঠনের সাংগঠনিক গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে হৃদয় দাসকে সাংগঠনিক সম্পাদক, তাঁতপুরী জেমস বিশ্বাসকে জ্যেষ্ঠ সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং দীপু দাসকে সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একইসাথে সংগঠক হিসেবে চন্দন কুমার বাঁসফোর, হেনা রানী এবং বৌরসেট্টি ত্রিনাদাকে অন্তর্ভুক্ত করে শক্তিশালী নেতৃত্ব গড়ে তোলা হয়, যারা দলিত ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ে একযোগে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বৈষম্যহীন ১৪ দফা সুনির্দিষ্ট দাবি

সমাবেশে বক্তব্য প্রদানকালে দলিত, হরিজন, রবিদাস ও তফসিলি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকার পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলো উত্থাপন করেন। সমাজে টেকসই সামাজিক সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্দোলনকারী নেতারা যৌথভাবে ১৪ দফা দাবি পেশ করেন। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে দলিত, তফসিলি ও হরিজন জনগোষ্ঠীকে দেশের সংবিধানে পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি প্রদান করা, প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ ‘বৈষম্য বিলোপ আইন-২০২৩’ দ্রুত প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা, এবং দলিত সম্প্রদায়ের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উপযুক্ত সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদান করা।

একইসাথে জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে সমস্ত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর সর্বস্তরে জনগোষ্ঠীর সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে এসব জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সঠিক ধারণা অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্য দূর করার দাবি তোলা হয়। পাশাপাশি ভূমিহীন পরিবারের জন্য স্থায়ী আবাসন ও জমির মালিকানা প্রদান, জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ও সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি সংস্কারের তাগিদ দেওয়া হয়। অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে নৃতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনা, বিশেষায়িত কমিশন গঠন, ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ, স্বাস্থ্যনীতিতে অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আউটসোর্সিং বন্ধ করে স্থায়ী নিয়োগ দান।

সামাজিক সমতা ও বৈষম্যহীন সমাজের অঙ্গীকার

সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অতিথি ও শীর্ষ নেতৃবৃন্দ গভীর প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন যে, একটি প্রকৃত সাম্যবাদী ও মানবিক দেশে ধর্ম, বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সমান সুবিধা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। বক্তারা স্পষ্ট জানান, পিছিয়ে পড়া ও অবহেলিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে জাতির সার্বিক অগ্রগতি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তারা এক বাক্যে স্বীকার করেন যে, দলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অধিকার পেলেই দেশ বৈষম্যমুক্ত ও শোষণহীন হিসেবে গড়ে উঠবে।

#জাতীয়জনজাতিজোট #দলিতঅধিকার #এনসিপি #বাংলাদেশ #প্রান্তিকজনগোষ্ঠী