কৃষি খাতের সংকট ও গুলশানকেন্দ্রিক ধানের রাজনীতি: নাগরিক নেতার ক্ষোভ

সম্প্রতি আয়োজিত এক সেমিনারে জাতীয় নাগরিক পার্টি-র মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দেশের বর্তমান কৃষি পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে মারাত্মক অসন্তোষ ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, অকাল অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে হাওর অঞ্চলের বিস্তৃত ফসলি মাঠ এবং কৃষকের পাকা ধান সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। দেশে ধান মার্কার সরকার বা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও কৃষকের সার্বিক ভাগ্যের কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি। বরং প্রকৃত কৃষকদের অধিকার ও স্বার্থ উপেক্ষা করে ‘ধানের রাজনীতি’ এখন সাধারণ গ্রামগঞ্জ থেকে স্থানান্তরিত হয়ে সম্পূর্ণভাবে বিত্তশালীদের কেন্দ্র গুলশান-এ আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, পুনর্বাসন ও ঐতিহাসিক রাজনীতির ঐতিহ্য

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তার বক্তব্যে ধানকেন্দ্রিক অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের প্রতাপ নিয়েও নানা সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “প্রয়োগিক অর্থে ধানকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট যারা রয়েছে, তাদের পুনর্বাসনের মূল দায়িত্বে যেন সরকার ও প্রধানমন্ত্রী রয়েছেন।” তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে যারা গুলশান-এর বড় ব্যবসায়ী, যাদের হাতে অগাধ টাকা রয়েছে এবং অতীতে হাওয়া ভবনের সঙ্গে যাদের গভীর যোগাযোগ ছিল, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব এখন তাদের হাতেই চলে গেছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি প্রখ্যাত কৃষক নেতা মওলানা ভাসানীর অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, মওলানা ভাসানী বাংলাদেশ-এ সত্যিকারের কৃষকনির্ভর ও মেহনতি মানুষের রাজনীতির সূচনা করেছিলেন এবং দলের প্রতীক হিসেবে ধানের শীষ নির্ধারণ করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে সেই প্রতীক রাজনৈতিকভাবে ছিনতাই হয়ে যায়। যদি সেই মূল ধারা এবং প্রতীকের চেতনা কৃষকের হাতে থাকত, তবে আজ হয়তো দেশের কৃষকের কষ্টার্জিত ধান এভাবে অকাতরে পানির নিচে তলিয়ে যেত না। ধানের রাজনীতি আগে বগুড়া অঞ্চল কেন্দ্রিক মেহনতি মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন তা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু গুলশান-এর প্রভাবশালী ও বিত্তশালী গোষ্ঠীর হাতে বন্দি হয়ে পড়েছে।

জাতীয় নিরাপত্তা এবং কৃষি ব্যবস্থার সার্বিক স্থিতিশীলতা

কৃষি খাতকে দেশের সার্বিক জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন, “জাতীয় নিরাপত্তা বলতে শুধু সশস্ত্র সামরিক শক্তি বা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রকে বোঝায় না, খাদ্যের সংস্থান ও কৃষি খাতের স্থায়িত্ব এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।” যদি দেশের কৃষি খাত কোনো কারণে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তবে এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কোটি কোটি সাধারণ মানুষ আর্থিক সংকটে পড়ে নানা অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারেন, যা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য বিশাল হুমকি তৈরি করতে পারে।

তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের একটি সিংহভাগ অংশই ছিলেন শ্রমজীবী ও কৃষক শ্রেণির সাধারণ মানুষ। তাদের এই বীরত্বপূর্ণ আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষা ছিল দেশের বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিলোপ এবং মৌলিক সামাজিক সংস্কার সাধন করা। তাই দেশের সামগ্রিক সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা সুসংহত রাখতে হলে কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে অবিলম্বে কৃষকের ধানের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং সরকারি ধান কেনার শর্তাবলি সহজ করা একান্ত আবশ্যক।

#রাজনীতি #কৃষি_সংকট #বাংলাদেশ #কৃষক_অধিকার