অধ্যাদেশ ও আইন সংশোধন নিয়ে এনসিপির তীব্র সমালোচনা: আব্দুল হান্নান মাসউদের বক্তব্য

রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক জাতীয় কনভেনশনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক এবং নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ বর্তমান সরকারের সাম্প্রতিক অধ্যাদেশ ও আইন পাসের কৌশল নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অভিযোগ করে বলেন যে, যেসব অধ্যাদেশ প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি-র কাছে সুবিধাজনক বা মিষ্টি মনে হয়েছে এবং যেগুলোকে ক্ষমতায় টিকে থাকার পথ সুগম ও প্রশস্ত করবে বলে তারা বিবেচনা করেছে, সরকার কেবল সেগুলোকে তড়িঘড়ি করে পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তর করেছে। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যেসব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বা নিয়মকানুন প্রশাসনকে জনগণের কাছে এবং আইনি প্রক্রিয়ার সামনে জবাবদিহিতার মুখোমুখি দাঁড় করাতো, সেগুলোকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বাতিল বা সংশোধন করে তাদের ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ জবাবদিহিতাহীন করে তোলা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা

ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত উক্ত জাতীয় সম্মেলনে মাসউদ অত্যন্ত বিস্তারিত আলোচনা করে বলেন যে, সরকার সম্প্রতি স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে পাস করিয়ে নিয়েছে। এর ভয়াবহ ও প্রত্যক্ষ প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, এই নতুন আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এখন থেকে যেকোনো নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিকে কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত, সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ কিংবা নিরপেক্ষ আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না গিয়েই সরাসরি স্বৈরাচারী কৌশলে তাদের পদ থেকে অপসারণ বা বরখাস্ত করা সম্ভব হবে। এটি সরাসরি দেশের স্থানীয় শাসনব্যবস্থার গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর এক চরম আঘাত হিসেবে গণ্য হবে।

তিনি আরও গুরুত্ব সহকারে যোগ করেন যে, কোনো নির্বাচনে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত কোনো জনপ্রতিনিধি—যেমন সিটি করপোরেশনের মেয়র বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান—যদি বিপুল জনমতে বিজয়ী হয়ে আসেন, তবে কেন্দ্রীয় সরকার কেবল নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে খুব সহজেই সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাবে। যদি ক্ষমতাসীন সরকার মনে করে যে সংশ্লিষ্ট নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বা হুমকিস্বরূপ, তবে কোনো যুক্তিসঙ্গত সুযোগ না দিয়েই নির্বাচিত প্রতিনিধিকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে সেখানে নিজেদের পছন্দের কোনো অনুগত প্রশাসক বসিয়ে পুরো এলাকার প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে। এটি সার্বিক গণতান্ত্রিক চর্চাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি

জাতীয় নাগরিক পার্টি-র সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত এই কনভেনশনে অন্যান্য বক্তারাও সরকারের এই ধরনের একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নেতৃবৃন্দ দাবি করেন যে, দেশে টেকসই সুশাসন ও প্রকৃত গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিটি কাঠামোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সবচেয়ে বেশি জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জবাবদিহিমূলক অধ্যাদেশসমূহ বাতিল করার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন শক্তিকে লাগামহীন ক্ষমতা চর্চার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এনসিপি-র পক্ষ থেকে অবিলম্বে এই জনস্বার্থবিরোধী স্থানীয় সরকার আইন পুনঃনিরীক্ষণ করা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়।

বক্তারা আরও বলেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন কিংবা নির্বাচিত যেকোনো সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা করা এবং স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি রোধ করা। রাজনৈতিক স্বার্থে আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রবণতা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চরম হুমকির মুখে পড়বে। গণমানুষের ভোটাধিকার ও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন রক্ষার স্বার্থে সকল প্রগতিশীল দলকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে সম্মেলন সমাপ্ত করা হয়।

#রাজনীতি #বাংলাদেশ #এনসিপি #সংবাদ #আইন_ও_বিচার