মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় আইনি সংস্কার অপরিহার্য: জাতীয় কনভেনশনে বক্তারা

কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তনে সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আয়োজিত জাতীয় কনভেনশনের একটি বিশেষ আলোচনা সেশন অনুষ্ঠিত হয়। কনভেনশনের উক্ত গুরুত্বপূর্ণ সেশনে দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অংশগ্রহণ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মৌলিক মানবাধিকারের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সার্বিক পর্যালোচনা তুলে ধরেন। উক্ত সেশনে সভাপতিত্ব করেন এনসিপি-র মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি তার বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, মানবাধিকার একটি সর্বজনীন ও অবিচ্ছেদ্য বিষয়, যা সমাজের সকল নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। যারা সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিন্ন মতাদর্শ লালন ও চর্চা করেন, তাদেরও এই অধিকার পাওয়ার পূর্ণ আইনি সুযোগ ও সামাজিক সুরক্ষা রয়েছে। কেবল সরকারের কোনো নীতি বা সিদ্ধান্তমূলক কাজের কঠোর সমালোচনা করার কারণে রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেফতার করা এবং জামিন না দিয়ে অহেতুক আইনি হয়রানি করা অবিলম্বে চিরতরে বন্ধ করার জোর দাবি জানান তিনি।

গণমাধ্যমের স্বাধীন ভূমিকা ও বর্তমান সময়ের নানামুখী চ্যালেঞ্জ

দেশের বর্তমান গণমাধ্যমের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বক্তারা বলেন, ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পরেও সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকৃত স্বাধীন পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, “৫ আগস্টের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যখন সংবাদমাধ্যম দখল করা শুরু হয়, সময়ের পরিক্রমায় সেগুলোর কেবল হাতবদলই ঘটেছে, কিন্তু গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি।” তিনি আরও বলেন, মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর বারবার রাজনৈতিক দল বদলের নীতির কারণে সাধারণ গণমানুষের আস্থা ও বিশ্বাস নাটকীয়ভাবে উঠে যাচ্ছে। ফলে মানুষ এখন নতুন ও বিকল্প সংবাদ মাধ্যমের দিকে দ্রুত ঝুঁকছে। আন্দোলন-সংগ্রামের সময়ে যখন মূলধারার মিডিয়াতে জনগণের প্রকৃত প্রতিবাদ এবং কণ্ঠস্বর প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তখন নতুন ধারার সংবাদ মাধ্যমগুলো অত্যন্ত ইতিবাচক ও সাহসী ভূমিকা পালন করেছিল। যথাযথ শক্তিশালী আইনি কাঠামোর চরম অভাব থাকার কারণেই স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের সহযোগীরা কঠোর শাস্তির মুখোমুখি না হয়ে উল্টো রাজনৈতিক সুবিধা লাভের চেষ্টা চালাচ্ছে।

সেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, মানবাধিকার কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা গোষ্ঠীর মানুষের জন্য একচেটিয়াভাবে সংরক্ষিত থাকতে পারে না। সমাজে ভিন্ন মতাবলম্বী রাজনৈতিক কর্মীদেরও মৌলিক মানবাধিকার, সামাজিক সুযোগ-সুবিধা এবং অর্থনৈতিক অধিকার সমানভাবে বজায় থাকতে হবে। তিনি বর্তমান বিচার ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে দেশে জামিন পাওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। কোনো মামলায় জামিন মঞ্জুর করার আগে বিচারকদের চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়তে হচ্ছে। জুলাইয়ের সমস্ত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঠিক ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জোর তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া এবং দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগেই অনেক মানুষকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন।

আইনি হয়রানি, ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি ও অপতথ্য রোধের উপায়

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে লেখালেখি করার কারণে সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার ও আইনি প্রক্রিয়ায় হয়রানি করার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আটকের পর জামিন দিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়, বরং এটি নাগরিকদের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির সূচনা করে।” তিনি উল্লেখ করেন, এভাবে সর্বস্তরের মানুষের মনে এক ধরনের মারাত্মক ভীতি তৈরি করার পুরোনো কৌশল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

কনভেনশনে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে গঠনমূলক সমালোচনাকে বারবার অপতথ্য হিসেবে আখ্যায়িত করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্তচিন্তা চর্চার পথকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বিগত সরকারের আমলে ঘটে যাওয়া হাজার হাজার গুমের ঘটনার সঠিক বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, অন্যায় ও অপরাধের বিচার না হলে ভবিষ্যতে দেশের শাসকশ্রেণি একই অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি করার দুঃসাহস পাবে। ফ্যাক্ট-চেকার ও মানবাধিকারকর্মী মিনহাজ আমান ভুয়া সংবাদ রোধে সাংবাদিকদের নিজস্ব পেশাগত দায়িত্বশীলতা ও আত্মোপলব্ধির ওপর জোর দেন।

রাজনৈতিক নিপীড়ন বন্ধ এবং স্বাধীন মিডিয়া কমিশন গঠনের তাগিদ

জাতীয় যুবশক্তি-র সভাপতি অ্যাডভোকেট তরিকুল ইসলাম বলেন, পূর্বে স্বাধীন মতামত প্রকাশের অপরাধে বিভিন্ন বিতর্কিত ডিজিটাল আইন ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে তা পরিবর্তিত হয়ে সরাসরি রাজনৈতিক মানহানির মামলায় রূপ নিয়েছে। স্থানীয় নেতাদের সাম্প্রতিক গ্রেফতারের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি আদালত ও বিচারকদের ওপর থেকে যেকোনো ধরণের রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক চাপ দূর করার জন্য কার্যকর রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। সাংবাদিক জায়মা ইসলাম তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, প্রস্তাবিত স্বাধীন মিডিয়া কমিশন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে সাংবাদিকরা রাজনৈতিক ভয়-ভীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপমুক্ত হয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। কনভেনশনে উপস্থিত সকল বক্তাই একবাক্যে বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং মানবাধিকারের নিশ্চয়তা বিধানের জোর দাবি ব্যক্ত করেন।

#মানবাধিকার #গণমাধ্যম #বাংলাদেশ #রাজনীতি