সংস্কারের বদলে পুরোনো ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার অভিযোগ: নাহিদ ইসলাম

ঢাকা-র একটি হোটেলে আয়োজিত ‘সংস্কার অচলাবস্থা: উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সংলাপে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন যে, সরকার কাঠামোগত পরিবর্তনের বদলে পুরোনো ক্ষমতা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চাইছে। তিনি বলেন, জনগণ স্পষ্টভাবেই দেশের শাসনব্যবস্থার মৌলিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষে মতামত দিয়েছে, কিন্তু বর্তমান শাসকগোষ্ঠী কেবল সামান্য কিছু বাহ্যিক সংশোধন এনে পুরোনো স্বৈরাচারী কাঠামো বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও জনগণের প্রত্যাশা

তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান কোনো সাধারণ রাজপথের আন্দোলন ছিল না। এটি ছিল ছাত্র, শ্রমিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সর্বস্তরের মানুষের এক অভূতপূর্ব জাতীয় জাগরণ। দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক শাসন, যা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করেছিল, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ধংস করেছিল এবং বাকস্বাধীনতা হরণ করেছিল, তার বিরুদ্ধে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ নামমাত্র কোনো সংস্কার চায়নি, তারা একটি দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক শাসনকাঠামো চেয়েছিল।

স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণ সুগম করা। এনসিপি শুরু থেকেই একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধানের দাবি জানিয়ে আসছে। ১৯৭২ সালের সংবিধান মূলত নির্বাহী ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ঘটিয়েছে এবং একদলীয় আধিপত্য বিস্তারে সহায়তা করেছে। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিরোধিতার কারণে নতুন সংবিধানের চূড়ান্ত প্রস্তাব থেকে সরে এসে ‘জুলাই সনদ’-এর আওতায় একটি ন্যূনতম সর্বসম্মত সংস্কারের পথ বেছে নেওয়া হয়।

গণভোট ও পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান

এই সনদের আওতায় বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান রক্ষা ও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সংসদ গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়, যা গণভোটে জনগণের বিপুল সমর্থন লাভ করেছিল। কিন্তু অভিযোগ করা হয়, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দল বিএনপি এই কাঠামোর সমর্থক থাকলেও পরবর্তীতে তারা নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে এবং সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ গঠনে অনীহা প্রকাশ করছে।

তিনি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে প্রণীত দুর্নীতি দমন, গুম প্রতিরোধ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংক্রান্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল বা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। একই সাথে নির্বাহী ক্ষমতা বৃদ্ধিকারী পুরোনো আইন বহাল রাখা হচ্ছে, যা রাষ্ট্রকে পুনরায় একটি এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

অর্থনীতি, প্রশাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

দেশের বর্তমান অর্থনীতি ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি নিয়েও হতাশা প্রকাশ করা হয়। নাহিদ ইসলাম বলেন, ব্যাংকিং খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার আটকে গেছে এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতপ্রকাশের জন্য নাগরিকদের এখনো গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, যা জুলাই বিপ্লবের আসল চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত। “ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে না দেখে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি,” বলে তিনি সতর্ক করেন। পরিশেষে, টেকসই স্থিতিশীলতার জন্য প্রতীকী সংস্কার ত্যাগ করে জনগণের দেওয়া গণভোটের ম্যান্ডেট দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।

#রাজনীতি #বাংলাদেশ #সংবাদ #সংস্কার