দুর্নীতির শিকড় ও অর্থনৈতিক সংকট: সংস্কারের তাগিদ

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ দেশে দুর্নীতির ভয়াবহতা তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে দুর্নীতি সমাজের প্রতিটি স্তরে অত্যন্ত গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমরা সব সময় দুর্নীতি নিয়ে কথা বলি, কিন্তু এটি আমাদের এত গভীরে ঢুকে গেছে যে অনৈতিক উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে ধর্মীয় বা সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করেও মানুষ সমাজে সম্মানিত আসন পেয়ে যাচ্ছে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই মৌলিক নৈতিক সংকটের সমাধান করতে না পারলে দেশে কোনো স্থায়ী ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না।

বেসরকারি খাতে ঋণের অভাব ও ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা

কাকরাইল-এর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আয়োজিত এক জাতীয় কনভেনশনে তিনি ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন বিশৃঙ্খলা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। শামস মাহমুদ জানান, বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে কমছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা। জাতীয় বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকার যখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়, তখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো স্বাভাবিকভাবেই ব্যক্তিশ্রেণির উদ্যোক্তাদের চেয়ে সরকারকেই অগ্রাধিকার দেয়। এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় ঋণ সুবিধা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছেন, যা দেশের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিকে স্থবির করে দিচ্ছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা

আলোচনায় তিনি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও দাবি ছিল তরুণ সমাজের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। তবে বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাত যদি একের পর এক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বন্ধ বা ধ্বংস হয়ে যায়, তবে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বেসরকারি খাতকে টিকিয়ে রাখতে না পারলে কর্মসংস্থানের সংকট আরও ঘনীভূত হবে বলে তিনি সতর্ক করে দেন।

অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও বিশেষজ্ঞ মতামত

উক্ত কনভেনশনে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বক্তারা একমত হন যে, দেশের অর্থব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে হলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং ব্যাংকিং খাতে দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম. মাসরুর রিয়াজ, বিডিজবস-এর সিইও ফাহিম মাসরুর এবং আর্থিক বিশ্লেষক আসিফ খান আলোচনায় অংশ নিয়ে খাতভিত্তিক সংস্কারের জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা পেশ করেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টি-র নেতারা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে না পারলে দেশের গণমানুষের মুক্তি আসবে না। সেজন্য অবিলম্বে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়নের জোর দাবি জানানো হয়।

#অর্থনীতি #দুর্নীতি #বাংলাদেশ #ব্যাংকিংখাত #কর্মসংস্থান