মিরপুরে ফ্ল্যাট থেকে বৃদ্ধার পচা-গলা লাশ উদ্ধার: সন্তানরা সবাই উচ্চশিক্ষিত

রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বরের একটি বাসা থেকে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের পচা-গলা এবং পোকা ধরা মরদেহ উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মর্মান্তিক এই দৃশ্য দেখতে পায়। ঘটনার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যুর পরও একই ফ্ল্যাটের পাশাপাশি ঘরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছিলেন তার স্কুলশিক্ষিকা মেয়ে, অথচ তিনি বিষয়টি কাউকে জানাননি। প্রতিবেশীদের ভাষ্য এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে পুলিশ ধারণা করছে, ওই নারী দীর্ঘদিন ধরে তীব্র মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিলেন।

পারিবারিক পরিবেশ ও অগোছালো জীবনের চিত্র

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানান, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বরে কলটি করেছিলেন ওই বৃদ্ধার দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা একজন নার্স। নার্স যখন কাজের উদ্দেশ্যে বাসায় এসে পৌঁছান, তখন তিনি বৃদ্ধার নিথর ও পচন ধরা দেহ দেখতে পান এবং তাৎক্ষণিকভাবে ৯৯৯-এ ফোন দেন। পুলিশ সেখানে গিয়ে দেখতে পায় পুরো ফ্ল্যাটটি অত্যন্ত নোংরা, দুর্গন্ধযুক্ত এবং জঞ্জালে ভরা ছিল। চারপাশের পরিবেশ একদম “ডাস্টবিনের মতো” বিশৃঙ্খল অবস্থায় পরিণত হয়েছিল, যা স্বাভাবিক জীবনযাপনের উপযোগী ছিল না।

সন্তানদের উচ্চপদস্থ অবস্থান ও পারিবারিক দূরত্ব

তদন্তে উঠে এসেছে যে মৃত বৃদ্ধা নুরজাহান বেগম তিন সন্তানের জননী ছিলেন। তার পরিবারের প্রতিটি সন্তানই সমাজে উচ্চশিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত হিসেবে পরিচিত। তার বড় ছেলে সরকারি চাকরির উচ্চপর্যায়ে যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত এবং মেজো ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একজন শিক্ষক। আর যে মেয়েটি মায়ের সঙ্গে একই বাসায় থাকতেন, তিনিও পেশায় একজন স্কুলশিক্ষিকা। তবে দুই ছেলে মায়ের থেকে আলাদা থাকতেন এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে কোনো ধরনের পারিবারিক যোগাযোগ বা সম্পর্ক ছিল না।

জিজ্ঞাসাবাদের সময় পরিবারের এই অস্বাভাবিক মানসিকতার রূপ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। বুয়েট শিক্ষক ছেলের কাছে যখন বড় ভাইয়ের যোগাযোগের নম্বর চাওয়া হয়, তখন তিনি পুলিশের হাতে একটি বহুবছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া সিটিসেল সংযোগের মোবাইল নম্বর তুলে দেন। এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আপন ভাইদের মধ্যেও বছরের পর বছর ধরে কোনো প্রকার তথ্য বিনিময় বা যোগাযোগ ছিল না।

আইনি প্রক্রিয়া ও ঘটনার সার্বিক তদন্ত

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনার পর নিহতের লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। প্রাথমিক তদন্ত শেষে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর নিহতের স্বজনরা মরদেহ গ্রহণ করে দাফন সম্পন্ন করেছেন বলে জানা গেছে। পুলিশ এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছে এবং পুরো বিষয়টি নিয়ে আরও গভীরভাবে জানার চেষ্টা চালাচ্ছে। সমাজ ও পারিবারিক বন্ধনের চরম অবনতি এবং উচ্চশিক্ষিত পরিবারে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব এই করুণ ঘটনার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

#মিরপুর #দুর্ঘটনা #বাংলাদেশ #অপমৃত্যু