ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ
জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ইসলামী ব্যাংকের ব্যাপক আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি অভিযোগ করেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী-র দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ার অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি নেওয়া ভোটারদের পরকালের নিশ্চয়তার পাশাপাশি নগদ ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির বিশেষ প্রকল্প ‘পল্লী উন্নয়ন স্কিম’ বা আরডিএসের আড়ালে এই বিশাল পরিমাণ অর্থ অনিয়মিত উপায়ে বণ্টন করা হয়েছে বলে তিনি জাতীয় সংসদে প্রকাশ্যে দাবি জানান।
নির্বাচনী প্রচার ও কোটি কোটি টাকার অনিয়ম
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এই প্রকল্পে নারী গ্রাহকদের টার্গেট করে ভোটের আগে ১০ হাজার টাকা এবং ভোটের পরে আরও ১০ হাজার টাকা করে বিতরণ করা হয়। “দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে জান্নাত পাওয়া যাবে—এমন ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটা হয়েছে,” বলে তিনি উল্লেখ করেন। আরডিএস প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থের কোনো সঠিক আইনি হিসেব বা নথিপত্র নেই। সরকার এই অর্থপাচার ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং আত্মসাৎ হওয়া টাকা ফেরত আনার জন্য সুষ্ঠু তদন্ত পরিচালনা করবে বলে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
শেয়ার দখল ও ব্যাংকিং খাতের মূল সংস্কার
ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ও মালিকানা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ব্যাংকের শেয়ারগুলো প্রকৃত ও বৈধ মালিকদের কাছে দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়া হবে। বর্তমানে একটি সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দখলে প্রায় ৮১ থেকে ৯২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের উত্থাপিত নোটিশের জবাবে তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকের মাধ্যমে প্রতিটি শেয়ার ক্রয়ের নেপথ্য সত্য খতিয়ে দেখা হবে।
তিনি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে ঋণ জালিয়াতির তথ্য দেন। উদাহরণস্বরূপ, নাবিল গ্রুপ ৭০০ কোটি টাকার এলসি সুবিধা নিয়ে টাকা ফেরত না দিয়ে একটি টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্যদিকে লান্তাবুর গ্রুপকে অনুমোদন ছাড়াই ৪০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সিএসআর ফান্ড বা সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের অর্থ দিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজার বিমানের টিকিট কাটার মতো হাস্যকর ও গুরুতর অনিয়ম সংগঠিত হয়েছে।
প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, বেআইনি নিয়োগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা
ব্যাংকের প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী জানান, অবৈধ দখলের পর নিয়মবহির্ভূতভাবে ৯ হাজার দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়, যা ব্যাংকিং সেক্টরে নজিরবিহীন। এর বিপরীতে একটি বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের ৬ হাজার নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়ম ভেঙে ৩টি পর্যন্ত পদোন্নতি দিয়ে ১৩ হাজার কর্মচারীকে রাতারাতি পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক কর্ম পরিবেশ বজায় রাখার গুরুত্ব জোর দিয়ে পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও স্পষ্টভাবে সতর্ক করেন যে, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ রেগুলেটরি ক্ষমতা রয়েছে। প্রয়োজনে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ বাতিল এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের দ্রুত অপসারণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
#ইসলামী ব্যাংক #অর্থনীতি #বাংলাদেশ #রাজনীতি