প্রস্তাবিত বাজেট জনস্বার্থবিরোধী: শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষায় কঠোর সমালোচনার মুখে সরকার
ঢাকা-র জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে জনস্বার্থবিরোধী ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষায় চরম ব্যর্থ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তি। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে একটি শ্রমিকবান্ধব বাজেট প্রণয়ন এবং দেশের বিশাল শ্রমশক্তির জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
বাজেটে শ্রম খাতের অবহেলা ও মূল্যস্ফীতির চাপ
সেমিনারে উপস্থিত বিশিষ্ট বক্তারা উল্লেখ করেন যে, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট গত বছরের তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে কমানো হয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে বাজেট বরাদ্দের এই হ্রাস অত্যন্ত অসঙ্গতিপূর্ণ। বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে শ্রমজীবী মানুষ চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছে। তা সত্ত্বেও বাজেটে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ আবাসন কিংবা সামাজিক সুরক্ষায় কোনো সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর দিকনির্দেশনা রাখা হয়নি।
আলোচকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সময় মূল চালিকাশক্তি শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি কিংবা শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অর্থবহ সংলাপ বা আলোচনা করা হয়নি। ফলে প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ শ্রমিকদের বাস্তবসম্মত চাহিদার কোনো সঠিক প্রতিফলন ঘটেনি, যা বাজেটের গ্রহণযোগ্যতা ও বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তোলে।
শিল্পাঞ্চলের সংকট ও টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ
সেমিনারে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে শ্রমজীবী মানুষের স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ বাসস্থান, সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষা, সুনির্দিষ্ট পেনশন ব্যবস্থা এবং বেকারত্বকালীন সরকারি সহায়তার মতো মৌলিক অধিকারগুলো উপেক্ষিত রয়েছে। এছাড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করা এবং কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বাজেটে কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা অনুপস্থিত।
বক্তাদের মতে, কেবল আয়-ব্যয়ের পরিসংখ্যান দিয়ে একটি দেশের টেকসই সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। মূল উৎপাদনমুখী শ্রমশক্তিকে উপেক্ষিত রেখে কোনো রূপরেখা প্রণয়ন করা হলে তা দেশের সার্বিক অর্থনীতিকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।
জাতীয় শ্রমিক শক্তির সুনির্দিষ্ট দাবি ও প্রস্তাবনা
সেমিনার থেকে শ্রমজীবী মানুষের বাঁচা-মরার স্বার্থ রক্ষায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করা হয়:
১. শ্রমিকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতীয় তহবিল গঠন এবং বাজেটে প্রয়োজনীয় বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
২. নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষের জন্য দ্রুত রাষ্ট্রীয় রেশনিং ব্যবস্থা কার্যকর করা।
৩. ঘনবসতিপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে আধুনিক ও বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল স্থাপন এবং সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
৪. শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্নির্ধারণ করা এবং বাণিজ্যিক ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীন কাজের সুযোগ ও শ্রম আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
সমাপনী বক্তব্যে আয়োজকরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণে একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শ্রমিকবান্ধব অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন না করা পর্যন্ত তাদের রাজপথের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
#জাতীয়বাজেট #শ্রমিকঅধিকার #অর্থনীতি #বাংলাদেশ