বাংলাদেশ ও নরওয়ের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও পারস্পরিক সহযোগিতা

ঢাকা শহরের সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকোন আরাল্ড গুলব্র্যান্ডসেন এই বৈঠকে মিলিত হন। অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উভয় দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করা হয়। বিশেষ করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের পথ সুগম করা, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষযগুলো আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।

ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব

বৈঠকের সূচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২ সালে নরওয়ের প্রারম্ভিক স্বীকৃতির কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি দেশের সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে উত্তর ইউরোপীয় দেশটির ধারাবাহিক সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন যে, বর্তমান সরকারের বৈদেশিক নীতিতে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে। এই নীতির প্রধান স্তম্ভ হলো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানব অধিকার রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।

সাক্ষাৎকালে নরওয়েজিয়ান রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক সূচকের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, নরওয়ে এখন চিরাচরিত সাহায্যভিত্তিক উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে সরে এসে সরাসরি ব্যবসা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং বাণিজ্যিক বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নরওয়ের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ থেকে নরওয়েতে রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি নরওয়ের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ শিল্প, চামড়াজাত পণ্য, আইটি খাত, পাটজাত পণ্য এবং চমৎকার হস্তশিল্পের বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিক্ষা ও জলবায়ু তহবিল

বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতিতে সবুজ শক্তি ও প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক জাহাজ নির্মাণ এবং প্যাকেজিং খাতে নরওয়ের বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানান। বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটে নরওয়ের আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে থাকা অন্যতম প্রধান দেশ।” তাই গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড এবং নরফান্ডের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে দ্বিপাক্ষিক সহায়তা আরও জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা, ডিজিটাল উদ্ভাবন, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিময় বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নরওয়েজিয়ান শিক্ষাবৃত্তির পরিসর প্রসারের জন্য অনুরোধ জানানো হয়।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধান ও ভবিষ্যৎ পথচলা

কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের প্রতি নরওয়ের ধারাবাহিক মানবিক সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেযাদী উপস্থিতি বাংলাদেশ-এর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থানীয় অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। তিনি রোহিঙ্গা নাগরিকদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই উপায়ে নিজ দেশে প্রত্যাবাসন সুনিশ্চিত করতে নরওয়ে এবং বিশ্ব সম্প্রদায়কে সমন্বিত ও জোরালো ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানান। নরওয়ের রাষ্ট্রদূত আশ্বস্ত করেন যে, জাতিসংঘসহ নানা আন্তর্জাতিক ফোরামে দুই দেশের এই পারস্পরিক বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা ও সুদৃঢ় সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

#বাংলাদেশ #নরওয়ে #কূটনীতি #বিনিয়োগ #বাণিজ্য