‘বন্ধু আজকে দোদুল্যমান পৃথ্বী, আমরা গঠন করব নতুন ভিত্তি’ স্লোগান নিয়ে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী শুক্রবার বিকেলে আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন করেছে। উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা পর্বে অংশ নেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে, সহসাধারণ সম্পাদক প্রদীপ ঘোষ, লেখক মামুন সিদ্দিকী এবং আবুল খায়ের। আলোচকেরা সুকান্ত ভট্টাচার্যের মাত্র ছয়-সাত বছরের সাহিত্যিক জীবন তুলে ধরেন। এত স্বল্প সময়েও তাঁর সৃষ্টি দশকের পর দশক ধরে বাঙালি জাতিকে আচ্ছন্ন, মুগ্ধ ও অনুপ্রাণিত করে চলেছে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা একই সঙ্গে সাহিত্যের দায় বহন করেছে এবং মতাদর্শ, রাজনীতি ও দলের পক্ষেও ভূমিকা পালন করেছে। বক্তারা আরও বলেন, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধিতা এবং মহাযুদ্ধের বিভীষিকাময় সময়ে ঔপনিবেশিক শাসকদের চক্রান্তে নেমে আসা মন্বন্তরের দিনগুলোতে সুকান্ত জনগণের প্রতিদিনের সংগ্রামের সঙ্গী ছিলেন।
বক্তারা সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোকপাত করেন। তাঁরা বলেন, সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রয়াণের প্রায় আট দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। তবে মানুষের কিছু মৌলিক সংকট আজও আগের মতোই বিদ্যমান। বৈষম্য, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, শ্রমজীবী মানুষের অনিশ্চিত জীবন, কৃষকের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, দুর্নীতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, সামাজিক অবিচার এবং পরিবেশগত সংকট—এসব প্রশ্ন আজও আমাদের সমাজকে নাড়া দেয়। এই কারণেই সুকান্ত ভট্টাচার্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম বলেন:
আমাদের জীবদ্দশায় আমাদের নানা সংগ্রাম ও আন্দোলনে সুকান্ত আমাদের পাশে থেকে হাজার সুকান্ত হয়ে আজও যুদ্ধ করেন তাঁর তীক্ষ্ণ কবিতা আর গানের অস্ত্র নিয়ে। যেখানেই সংগ্রাম-যুদ্ধ, সেখানেই সুকান্ত।
আলোচনা পর্ব শেষে সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ, ঢাকা মহানগর সংসদসহ বিভিন্ন শাখা সংসদের নেতা-কর্মীরা শত প্রদীপ প্রজ্বালন করে শ্রদ্ধা জানান। উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি বেলায়েত হোসেন সুকান্তের ‘ছাড়পত্র’ কবিতাটি সবাইকে শপথ হিসেবে পাঠ করান। ওয়ার্দা রিহাবের পরিচালনায় ধৃতি নর্তনালয়ের শিল্পীরা সুকান্তের লেখা ‘অবাক পৃথিবী’ গানটির সঙ্গে দলীয় নৃত্য পরিবেশন করেন।
অনুষ্ঠানে উদীচীর সংগীত বিভাগের শিল্পীরা সুকান্তের কবিতায় সুরারোপিত গান পরিবেশন করেন। গানগুলোর মধ্যে ছিল ‘হে মহামানব একবার এসো ফিরে’, ‘হে সাথী আজকে স্বপ্নের দিন গোনা’ এবং ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ’। একক সংগীত পরিবেশন করেন অলক দাশগুপ্ত, জয়া সেনগুপ্তা, শাওন কুমার রায়, সরস্বতী সরকার, বিজয় বণিক।
আবৃত্তিও ছিল অনুষ্ঠানের অংশ। উদীচী কেন্দ্রীয় আবৃত্তি বিভাগের শিল্পীরা ‘বন্ধু আজকে দোদুল্যমান পৃথ্বী, আমরা গঠন করব নতুন ভিত্তি’ শীর্ষক সম্মেলক আবৃত্তি পরিবেশন করেন। এর পরিকল্পনা করেন বেলায়েত হোসেন এবং নির্দেশনা দেন শিখা সেনগুপ্তা। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন মাসুদুজ্জামান, শিখা সেনগুপ্তা ও সুমিত পাল, বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করে স্রোত আবৃত্তি সংসদ। আয়োজনের মধ্য দিয়ে সুকান্ত ভট্টাচার্যের সাহিত্য ও দর্শনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।