আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। চলমান গাজা সংঘাত এবং ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আবহে এই নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কর্তৃক তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর উত্থান এই নির্বাচনকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইসরায়েলের দীর্ঘতম মেয়াদের সরকারপ্রধান বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত তিন দশকে প্রায় ১৯ বছর দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আইসিসি তার এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে, যার মধ্যে ক্ষুধাকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। ফিলিস্তিন প্রশ্নে তার অবস্থান সুস্পষ্ট: তিনি বারবার ঘোষণা করেছেন যে তার অধীনে কোনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্ম তিনি কখনো হতে দেবেন না। ওয়াশিংটনের চাপও তাকে এই অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি। নেসেটের আসনসংখ্যা ১২০। সরকার গঠন করতে অন্তত ৬১ আসনের সমর্থন প্রয়োজন, যা কোনো একক দলের পক্ষে পাওয়া কার্যত অসম্ভব। তাই জোট গঠনই সেখানে ক্ষমতার আসল খেলা। রাজনৈতিক মৃত্যুর দুয়ার থেকে বারবার ফিরে আসার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য নেতানিয়াহুকে ইসরায়েলি রাজনীতির চূড়ান্ত ‘সারভাইভার’ বলা হয়। এবারের নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন গাদি আইজেনকোট, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর তিনি নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে যুদ্ধ পরিচালনায় সরকারের অযোগ্যতার অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন। এই যুদ্ধে তার ২৫ বছরের ছেলে এবং দুই ভাগনে নিহত হন, যা ইসরায়েলি সমাজের একটি বড় অংশের সহানুভূতি তার রাজনৈতিক পুঁজির বড় উৎস। তার নবগঠিত দল ‘ইয়াশার’ জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সঙ্গে সমানে সমান লড়ছে। নেতানিয়াহুর জোট সরকারের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির এই নির্বাচনের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কিশোর বয়সে উগ্রপন্থী মতাদর্শের কারণে তাকে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়নি। পরবর্তীকালে আদালত তাকে বর্ণবাদে উসকানি ও একটি নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠনকে সমর্থনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। প্রায় ২৫ বছর ধরে তার বসার ঘরের দেয়ালে ঝুলত বারুখ গোল্ডস্টেইনের ছবি, যিনি ১৯৯৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি হেবরনের ইব্রাহিমি মসজিদে ফজরের নামাজরত মুসল্লিদের ওপর গুলি চালিয়ে ২৯ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছিলেন। সম্প্রতি, ১৫ আগস্ট প্রচারিত এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে বেন গভির বলেছেন, গাজায় প্রতি রাতে ‘টার্গেটেড’ হামলা চালিয়ে ৩০ থেকে ৪০ জনকে হত্যা করা উচিত। তার ভাষায়, ‘ওখানে এমন মানুষ আছে, যারা বেঁচে থাকার যোগ্য নয়।’ ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হন, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। সেদিন ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। এর জবাবে ইসরায়েল যা করেছে, তা মানব ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায় হয়ে থাকবে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে নিহতের সংখ্যা এরই মধ্যে ৭৩ হাজার ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে শিশুই প্রায় ২০ হাজার। ২০২৫ সালের আগস্টে জাতিসংঘ-সমর্থিত আন্তর্জাতিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইপিসি আনুষ্ঠানিকভাবে গাজা সিটি ও আশপাশের এলাকায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করে। এই সংঘাতের মধ্যে বেশ কিছু মর্মান্তিক ঘটনা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে গাজা সিটিতে ছয় বছরের ছোট্ট শিশু হিন্দ রজব ও তার পরিবারের সদস্যদের ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এছাড়া, ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল ক্ষুধার্ত গাজাবাসীর জন্য খাবার পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের সাতজন ত্রাণকর্মী ড্রোন হামলায় নিহত হন। পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে খোদ ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিকেও মুখ খুলতে হয়েছে।