বাংলাদেশে গুমের ঘটনাগুলোর স্বাধীন তদন্তের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপনের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। এই বিলটি গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের পূর্ববর্তী অধ্যাদেশের কাঠামো থেকে সরে এসেছে, যা নিরপেক্ষ তদন্তের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বাগেরহাটের মোংলার মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে, যেখানে তাঁর পরিবার কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে তাঁকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশের পরও তাঁর অবস্থান অজানা রয়ে গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অবশ্য বলেছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে কোনো গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি।

নতুন বিলের বিধান ও তদন্তের স্বাধীনতা

সংসদে উত্থাপিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ অনুযায়ী, কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনী নিজে তদন্ত করতে পারবে না। এক্ষেত্রে সরকার অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলকে দায়িত্ব দেবে। তবে তদন্তকারী সংস্থা রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামোর মধ্যেই থাকবে এবং কে তদন্ত করবে, তা সরকার নির্ধারণ করবে, যা তদন্তের স্বাধীনতা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের প্রায়শই সাদাপোশাকে তুলে নেওয়া হতো এবং পরিচয় গোপন করতে এক বাহিনীর সদস্যরা অন্য বাহিনীর নাম ব্যবহার করতেন, যা অভিযুক্ত বাহিনী শনাক্তকরণ কঠিন করে তোলে।

অন্তর্বর্তী অধ্যাদেশ ও বর্তমান বিলের পার্থক্য

অন্তর্বর্তী সরকারের ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী, গুমের অভিযোগের তদন্তের নিয়ন্ত্রণ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে ছিল। কমিশন গোপন আটককেন্দ্র পরিদর্শন করতে পারত এবং ব্যক্তি না পাওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে বিএনপি সরকারের নতুন বিলে গুমের অভিযোগের ফৌজদারি তদন্তের নিয়ন্ত্রণ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে রাখা হয়নি। এছাড়া, অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আটকস্থল পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, যা নতুন বিলে নেই। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা গুম প্রতিরোধে সব আটকস্থল স্বাধীন কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনের আওতায় রাখার সুপারিশ করেছেন।

তদন্ত কমিশনের অনুসন্ধান, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য উদ্বেগ

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গুমের অভিযোগ অনুসন্ধান করে এবং বিভিন্ন সংস্থার সংশ্লিষ্টতা উঠে এসেছে। ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। একই দিনে গুম থেকে প্রত্যেক মানুষের সুরক্ষা-সম্পর্কিত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সনদে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার দুই বছর পূর্ণ হলো। জাতিসংঘের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া নিয়ে সরকারকে আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ পাঠিয়েছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, গুম হওয়া ব্যক্তিকে খোঁজা আর অপরাধীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত এক বিষয় নয়। গুমের খবর পাওয়া মাত্র আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা মামলার অপেক্ষা না করে অনুসন্ধান শুরু হওয়া উচিত।

নতুন বিলে আলাদা গুম ট্রাইব্যুনালের কাঠামো রাখা হয়নি এবং বিচার সাধারণ দায়রা জজ আদালতে হবে। মিথ্যা অভিযোগের সাজা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর করা হয়েছে, যা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। গুমের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের তত্ত্বাবধান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিবর্তে সরকারের হাতে রাখা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, একটি স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করা সবচেয়ে নিরাপদ, যার নিয়ন্ত্রণ পুলিশ বা কোনো বাহিনীর হাতে থাকবে না। তাহলেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব হবে।