নব্বইয়ের দশকের শুরুতে চীনা নেতা ডেং জিয়াওপিংয়ের একটি মন্তব্য, "মধ্যপ্রাচ্যে তেল আছে, আর চীনের আছে রেয়ার–আর্থ বা দুষ্প্রাপ্য মৌল," সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। অনেকেই এই উক্তিকে চীনের একটি গোপন হুমকির বার্তা হিসেবে দেখছেন, যা গত এক বছরের ঘটনাপ্রবাহে আরও জোরালো হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তিতে রেয়ার–আর্থের অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে এবং এর ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ এখন একটি শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও বিকল্প উৎস খোঁজার প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে। তবে চীনের এই একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কোনো দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের ফল নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন স্বার্থের জটিল সংমিশ্রণ থেকে এর জন্ম। ডেং জিয়াওপিং যখন এই ঐতিহাসিক উক্তিটি করেছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ শেষ করেছে। বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে, সেই মার্কিন অভিযান আধুনিক যুদ্ধ পরিচালনায় চীনের দুর্বলতা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ কীভাবে সংঘাতের কারণ হতে পারে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছিল। ভূরাজনৈতিক যুদ্ধে সরবরাহ শৃঙ্খলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের কোনো দূরদর্শী পরিকল্পনা থেকে এর উৎপত্তি হয়নি। বরং দেশের ভেতরের অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা থামানোর জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছিল, কারণ অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার ফলে দাম অনেক কমে যাচ্ছিল এবং প্রাকৃতিক সম্পদ দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। রেয়ার–আর্থ শিল্পের বিকাশ ও নিয়ন্ত্রণ ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিক থেকে ইনার মঙ্গোলিয়ার ‘বায়ান ওবো’ খনি চীনের রেয়ার–আর্থ শিল্পের মূল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ১৯৬০-এর দশকে দক্ষিণাঞ্চলীয় জিয়াংশি ও গুয়াংডং প্রদেশে নতুন খনির সন্ধান মেলে। ১৯৮০-এর দশকের প্রথমার্ধে রসায়নবিদ জু গুয়াংশিয়ান কম খরচে রেয়ার–আর্থ পৃথক করার নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করলে চীন বড় মাপের মানসম্পন্ন উৎপাদন শুরু করতে সক্ষম হয়। চীনা নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন যে রেয়ার–আর্থ এমন এক প্রাকৃতিক সম্পদ, যা অপচয় করা যাবে না। ১৯৮২ সালের শুরুতেই ডেং জিয়াওপিং এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ফাং ই ‘রেয়ার–আর্থ ও অন্যান্য দুর্লভ ধাতুর উৎপাদন বাড়াতে’ নির্দেশ দেন। আশির দশকজুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো। রেয়ার–আর্থ বাস্তবে দুর্লভ না হলেও, উত্তোলনযোগ্য পরিমাণে এর উপস্থিতি পাওয়া বেশ কঠিন এবং এগুলো প্রক্রিয়াজাত করার প্রযুক্তি অত্যন্ত জটিল ও চরম পরিবেশদূষণকারী। তাই রপ্তানি বাড়াতে গিয়ে এই খাতে শিথিল তদারকি মেনে নেওয়া হয়। ১৯৮৬ সালের মধ্যে চীনের উৎপাদন ১৯৭৮ সালের তুলনায় ১০ গুণ বেড়ে যায় এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে চীন বিশ্বের বৃহত্তম রেয়ার–আর্থ উৎপাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আমেরিকা ও ইউরোপ চীনের এই উত্থানকে স্বাগত জানিয়েছিল। ১৯৯০-এর দশকজুড়ে চীনের এই উদীয়মান শিল্পকে দেশের অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হিসেবেই দেখা হতো। ১৯৯০ সালে এগুলোকে ‘সংরক্ষিত ও কৌশলগত খনিজ’ হিসেবে ঘোষণার পর, চীন অনুসন্ধান ও প্রক্রিয়াকরণে বিদেশি বিনিয়োগ সীমিত করতে শুরু করে। তবে কোনো কার্যকর তদারকি না থাকায় শতকের শেষভাগে এসে চীনের রেয়ার–আর্থ শিল্প এক বিশৃঙ্খল রূপ নেয়। অনিয়ন্ত্রিত উৎপাদনের ফলে দেশীয় বাজারে দরপতন ঘটে এবং রপ্তানি মূল্য তলানিতে গিয়ে ঠেকে। অনেক বিশ্লেষক দাবি করেন, বিদেশি প্রতিযোগীদের বাজার থেকে নিশ্চিহ্ন করতেই চীন ইচ্ছে করে রেয়ার–আর্থের দাম কমিয়ে রেখেছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চীনা কর্মকর্তারা নিজেরাই এই কম দাম নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। ২০০২ সালের মধ্যে বেইজিং এই বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কেন্দ্রীয় সরকার অবৈধ খনি ও পরিবেশদূষণকারী কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এরপর ২০০৫ সালে বেইজিং রেয়ার–আর্থের রপ্তানি কর ফেরত সুবিধা বাতিল করে এবং ২০০৭ সালে সব ধরনের আকরিক, অক্সাইড ও উপাদান রপ্তানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে।