চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) ঐতিহাসিক ‘লংমার্চ’ ৯০ বছর পূর্ণ করেছে। গত জুলাই মাসে সিপিসি তার ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করেছে। এই লংমার্চকে সিপিসি কেবল একটি রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেনি, বরং এটিকে চিরস্থায়ী অনুপ্রেরণা এবং জাতীয় মানসিকতায় রূপান্তরিত করেছে। বর্তমান নেতা সি চিন পিং চীনের অগ্রগতির ইতিহাসকে ‘মহাকাব্যিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। এই লংমার্চের ধারাবাহিকতা কেবল চীন নয়, বিশ্বকেও দ্রুত বদলে দিচ্ছে বলে চীনা ভাষ্যকাররা মনে করেন। নতুন চীনের জন্ম মাও সে-তুংয়ের হাত ধরে হলেও, এর জাদুকরি অগ্রগতির সূচনা করেন দেং জিয়াও পিং। এই প্রক্রিয়াকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন বর্তমান নেতা সি চিন পিং। চীনা ভাষ্যকারদের মতে, চীনের এই অগ্রগতির রহস্য বুঝতে হলে মাওদের লংমার্চের মনোবিদ্যাকে অনুধাবন করা জরুরি। লংমার্চের গতি ও চীনের মনন লংমার্চের ঘটনা শুরু হয়েছিল চীনের দক্ষিণ-পূর্বের রুইজিনে। ১৯৩৪ সালে প্রতিপক্ষের ঘেরাও থেকে বাঁচতে সিপিসির কৃষক-ক্যাডাররা এখান থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরে দেশের অন্য প্রান্তে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় এক লাখ ক্যাডারের এই পথচলা দুই বছর ধরে চলেছিল। পথে বিরূপ প্রকৃতি এবং নিষ্ঠুর প্রতিপক্ষের হামলা ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৩৬ সালে মাত্র ১০ হাজার ক্যাডার টিকে ছিলেন। তাদের কৌশল ছিল ‘সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে যাও’। আজকের চীনও একই কৌশল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। লংমার্চ শেষ হয় ইয়ানানে। লংমার্চে অংশ নেওয়া শেষ জীবিত ব্যক্তি ওয়াং গুইজিয়াং গত ২২ জুলাই ১০৪ বছর বয়সে মারা গেছেন। ওয়াংয়ের প্রয়াণের মধ্য দিয়ে এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক অধ্যায়ের শারীরিক যোগসূত্র শেষ হলো। দারিদ্র্য নির্মূল এবং প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত উৎকর্ষে আজকের চীনের অর্জনগুলো মূলত ৮০ বছর আগের লংমার্চের ধারাবাহিকতা। লংমার্চের এই মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা বুঝতে না পারলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চীনকে সঠিকভাবে বোঝা সম্ভব নয়। সিপিসির উত্থান ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি সিপিসি ১৯২১ সালে মাত্র ১৩ জন সদস্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৪৯ সালে তারা ক্ষমতা দখল করে। সে সময় চীন ছিল কৃষিনির্ভর একটি অনুন্নত দেশ। ৭৭ বছর পর আজ দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। তারা ১৫১টি দেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। ১৯৪৯ সালে বিপ্লবের বছর চীনের জিডিপির আকার ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার, যা এখন ১৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, অর্থাৎ ১৩০০-১৪০০ গুণ বড়। ক্ষমতায় আসার সময় সিপিসি প্রায় ৫৪ কোটি মানুষের দায়িত্ব নিয়েছিল, যাদের ৮০ ভাগ দরিদ্র ছিল। বর্তমানে চীনের জনসংখ্যা প্রায় ১৪০ কোটি; তবে সেখানে ‘চরম দারিদ্র্য’ আর অবশিষ্ট নেই। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সময়সীমার এক দশক আগেই তারা এই লক্ষ্য পূরণ করেছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বে চরম দরিদ্রের সংখ্যা যত কমেছে, তার ৬০ ভাগ অবদান সিপিসির। যেহেতু চীন এখন উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ, সেই হিসাবে নতুন মানদণ্ড অনুযায়ী সেখানে ‘আপেক্ষিক দরিদ্র’ প্রায় ১০ শতাংশ। নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এই আপেক্ষিক দারিদ্র্য নির্মূল এবং শহর-গ্রামের ব্যবধান কমানোর সংগ্রামকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও নীতিগত মোড়বদল সাধারণভাবে চীনাদের মত হলো—মাও দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেন, দেং সমৃদ্ধির পথ দেখান এবং সির বাসনা দেশকে পরাশক্তিতে পরিণত করা। এই তিন নেতারই শক্তির জায়গা হলো সিপিসি তথা একদলীয় ব্যবস্থা। মাও নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি, সামাজিক মালিকানা ও নিরন্তর শ্রেণিসংগ্রামের পক্ষে ছিলেন। তাঁর পর দেং অর্থনীতিতে সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের পক্ষ নেন এবং ‘বাজার জয়’কে গুরুত্ব দেন। সর্বোচ্চ ক্ষমতায় কারও দুবারের বেশি থাকার বিরুদ্ধে নিয়ম হয় তখন। সি চিন পিং এসে সেই নিয়ম পরিবর্তন করেন। তবে তিনি দেংয়ের অর্থনৈতিক নীতি ধরে রাখেন এবং প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব ও আধুনিকতার বাসনা জাতীয় মননে ছড়িয়ে দেন।