গত ২৭ আগস্ট গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল ওয়ারেছের আমন্ত্রণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪ জন শিক্ষার্থী জাতীয় সংসদ ভবন পরিদর্শনে এসে গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র সম্পর্কে এক নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। সংসদ সদস্যের সহকারী শাকিল আহমেদ তাদের অভ্যর্থনা জানান এবং কঠোর নিরাপত্তা তল্লাশি পেরিয়ে তাদের পুরো কমপ্লেক্স ঘুরিয়ে দেখান। ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে তারা বিশাল স্তম্ভ, সুউচ্চ ছাদ এবং নিস্তব্ধতার মধ্যে এক গভীর গাম্ভীর্য অনুভব করেন।
শিক্ষার্থীদের প্রথম গন্তব্য ছিল দর্শক গ্যালারি। সেখানে তারা সংসদের চলমান তৃতীয় অধিবেশনের দৃশ্য দেখেন। স্পিকারের মহিমান্বিত আসন, সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের আসন বিন্যাস তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রশ্নোত্তর পর্বে আইনপ্রণেতাদের তর্ক-বিতর্ক এবং কার্যপ্রণালির শৃঙ্খলা ছিল রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। গ্যালারিতে অবস্থানকালে শাকিল আহমেদ সংসদ ভবনের স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা দেন। মূল অধিবেশন কক্ষের পরাবৃত্তাকার ছাদটি প্রায় ১১৭ ফুট উঁচু এবং এতে স্বচ্ছ উপকরণ ও জ্যামিতিক কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো সরাসরি কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করে। সম্প্রতি মহান মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠের স্মৃতি সংরক্ষণে গ্যালারিগুলোর নতুন নামকরণ করা হয়েছে। স্পিকারের আসনের ঠিক পেছনের দেয়ালে পবিত্র কালেমা তাইয়্যেবার আরবি ক্যালিগ্রাফি যুক্ত করা হয়েছে।
অধিবেশন শেষে শিক্ষার্থীদের ভবনের ক্যাফেটেরিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে সংসদ সদস্য মো. আব্দুল ওয়ারেছ তাদের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর বাইরে প্রাঙ্গণে একটি দলীয় আলোকচিত্র তোলা হয়। শিক্ষার্থীরা পুরো সংসদ ভবন কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন, যা প্রায় ২০০ একর জমির ওপর বিস্তৃত এবং মূল প্লাজা, দক্ষিণ প্লাজা ও রাষ্ট্রপতি প্লাজা—এই তিনটি ভাগে বিভক্ত। এর বিশাল পরিসরের কারণে একে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আইনসভা ভবন হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্লাজা পেরিয়ে শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংসদের গ্রন্থাগারে পৌঁছান। সেখানে শাকিল আহমেদ সংসদ ভবনের জন্মকথা এবং স্থপতি লুই আই কানের নকশার বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেন। লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত সংবিধানের বিবর্তনের ইতিহাস, বিরল দলিলপত্র এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গ্রন্থরাজির পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা হাতে লেখা বাংলাদেশের মূল সংবিধানের একটি প্রতিলিপি দেখতে পান। লুই আই কানের নকশার আসল রহস্য উন্মোচিত হয় তার ডিজাইন দর্শনে। ১৯৬২ সালে তিনি প্রথমবার ঢাকায় আসেন এবং এক বছর সময় নিয়ে সম্পূর্ণ নকশাটি তৈরি করেন। ১৯৬৩ সালের মার্চে তিনি পুনরায় ঢাকায় ফেরেন। বাংলাদেশের নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতি, বন্যাপ্রবণ পরিবেশ ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে অনুধাবন করেই তিনি নকশায় জলাধার, খোলা প্লাজা আর আলো-বাতাসের বিশেষ বিন্যাস যুক্ত করেন। এই স্থাপনা কেবল ক্ষমতার প্রতীক নয়, এটি একটি জাতির শিল্পবোধেরও পরিচায়ক।
নিজের এলাকার একজন জনপ্রতিনিধির উদ্যোগে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানকে এত কাছ থেকে দেখার এই সুযোগ শুধু একটি ভ্রমণ ছিল না, ছিল দেশ ও গণতন্ত্রকে নতুন করে চেনার এক গুরুত্বপূর্ণ পাঠ।