ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। ট্রাম্প ভারতের ওপর চড়া শুল্ক আরোপ করেছেন, নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছেন এবং চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করেছেন, যা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক হুমকির কারণ। এই টানাপোড়েন সত্ত্বেও ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং নয়াদিল্লি একটি ‘আমেরিকা প্লাস’ কৌশল গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি অন্যান্য শক্তি, বিশেষ করে ওয়াশিংটনের মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগের পরিধি বাড়ানো। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ট্রাম্পের একের পর এক উসকানিতে সংযম দেখিয়েছেন। তিনি ওয়াশিংটন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক বিস্তৃত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ‘কোয়াড’ জোটকে সচল রেখেছেন, মার্কিন মিত্রদের কাছাকাছি এসেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছেন এবং চীনের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করেছেন। ট্রাম্পের নীতি ও সম্পর্কের টানাপোড়েন ২০২৪ সালজুড়ে নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচন নিয়ে উৎফুল্ল ছিল। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে দুই নেতার বন্ধুত্ব বজায় থাকার কথা মনে হলেও, সেই উষ্ণতা দ্রুতই কমে যায়। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার একটি স্বল্পস্থায়ী সামরিক সংঘাত বন্ধের কৃতিত্ব দাবি করেন ট্রাম্প। ভারত তা অস্বীকার করে। এরপর ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধান সৈয়দ অসিম মুনিরের ওপর আলাদা নজর দেন এবং হোয়াইট হাউসের কূটনীতিতে পাকিস্তানকে ওপরের সারিতে তুলে আনেন। বাণিজ্য উত্তেজনায় সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ভারতের সংরক্ষণবাদী নীতি এবং রাশিয়ান তেল কেনার অজুহাতে ট্রাম্প যখন চড়া শুল্ক আরোপ করেন, তখন বহু ভারতীয় অনুভব করেন যে তাঁদের সঙ্গে অন্যায্য আচরণ করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের শেষের দিকে মার্কিন অংশীদারদের মধ্যে ভারতেই সবচেয়ে বেশি শুল্কের মুখোমুখি হতে হয়। এসব কারণে ২০২৫ সালে ভারতে মার্কিনবিরোধিতা আবার চড়াও হতে শুরু করে। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী মোদির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণের অভিযোগ তোলেন। ‘আমেরিকা প্লাস’ কৌশল ও ভারতের বহুমুখী কূটনীতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমান সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভারতের বহু বছর সময় লেগেছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সামরিক জোট, চীনের সঙ্গে তাদের সখ্য এবং রাশিয়ার প্রতি ভারতের ঐতিহাসিকভাবে ঝুঁকে থাকা যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি করেছিল। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক জোড়া লাগানোর সুযোগ তৈরি করে। ২০০৫ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের মধ্যকার ঐতিহাসিক বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তিটি ছিল এক বিরাট সাফল্য। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে উঠেপড়ে লাগেন। তিনি বারাক ওবামা, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জো বাইডেন—তিনজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক বজায় রাখেন। ট্রাম্প যখন দ্বিতীয় মেয়াদে ফেরেন, তত দিনে মার্কিন ব্যবসা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রবাসী ভারতীয়দের শক্ত ভিত্তির ওপর ভর দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক অনেকটাই মজবুত হয়ে গেছে। ভারতের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সামরিক পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তিগত উন্নতি এখন বহুলাংশে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে অন্যান্য মহাশক্তির সঙ্গেও সম্পর্ক ধরে রেখেছেন। ২০২৩ সালে রাশিয়া ভারতের শীর্ষ তেল সরবরাহকারীতে পরিণত হয়। চীনের প্রতিও মোদির কূটনীতি প্রসারিত হয়েছে। ২০১৪, ২০১৭ এবং ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘাত সত্ত্বেও নয়াদিল্লি বেইজিংয়ের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে মরিয়া। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ভারতের বর্তমান কৌশলকে ‘আমেরিকা প্লাস’ বলা ভালো। ভারত এমন একটি দেশ, যা বরাবরই কৌশলগত দূরত্ব রেখে চলে, তবে এবার সে তার ঝুড়ির বড় অংশটি যুক্তরাষ্ট্রের ঘরেই রেখেছে।