সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদসংলগ্ন একমাত্র সরকারি গণপাঠাগারটি প্রায় এক যুগ ধরে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে স্থানীয় শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বই পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসন পাঠাগারটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। পাঠাগারটির দরজা তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে এবং এর কোনো নামফলকও নেই। সরেজমিনে দেখা গেছে, পাঠাগারটির আশপাশ ও দেয়ালজুড়ে আগাছা জন্মেছে। এক কক্ষবিশিষ্ট এই পাঠাগারের জানালার কাচ দিয়ে ভেতরে তাকালে একটি তাকে শতাধিক জরাজীর্ণ বই এবং পাশে ছয়টি চেয়ার দেখা যায়। একসময় যেখানে প্রতিদিন পাঠকদের আনাগোনা ছিল, সেই পাঠাগার এখন কেবল স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। পাঠাগারের প্রতিষ্ঠা ও বারবার বন্ধ হওয়ার ইতিহাস উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৩ সালে তৎকালীন থানা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান ভূঞার উদ্যোগে এবং এলাকাবাসীর সহযোগিতায় এই পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর এটি শত শত মূল্যবান বই দিয়ে সমৃদ্ধ ছিল এবং প্রতিদিন মানুষের উপস্থিতিতে জমজমাট থাকত। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অব্যবস্থাপনার কারণে পাঠাগারটির কার্যক্রম কয়েক দফায় বন্ধ হয়েছে। ২০০৪ সালের বন্যায় পাঠাগারের ভেতরে পানি ঢুকে এর বই ও আসবাবপত্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়, যার ফলে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে উপজেলা প্রশাসন নতুন করে বই সংগ্রহ ও আসবাবপত্র সংস্কার করে পাঠাগারটি পুনরায় চালু করে। কিন্তু এই উদ্যোগও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এক বছরের মাথায় ২০০৮ সালে পাঠাগার থেকে আট শতাধিক মূল্যবান বই এবং বেশ কিছু আসবাবপত্র চুরি হয়ে যায়। এই চুরির ঘটনার পর পাঠাগারটির কার্যক্রম আবারও বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ‘ধরমপাশা সাহিত্য পরিষদ’ নামে একটি সংগঠনের সদস্যরা পাঠাগারটি চালুর দাবিতে এর চত্বরে আমরণ অনশন শুরু করেন। এই আন্দোলনের মুখে উপজেলা প্রশাসন পাঠাগারটি পুনরায় চালু করতে বাধ্য হয়। তবে এই চালুকরণও স্থায়ী হয়নি। ২০১৪ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ভবনের টিনের ছাউনির একটি অংশ ভেঙে যায়। এরপর বৃষ্টির পানি ঢুকে ভেতরে থাকা পাঁচ শতাধিক বই নষ্ট হয়ে যায়। এই ঘটনার পর পাঠাগারটি আবারও বন্ধ হয়ে যায় এবং এরপর থেকে এটি আর চালু হয়নি। শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ধর্মপাশা সরকারি ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ইয়াদুল ইসলাম বলেন, পড়াশোনা ও জ্ঞানচর্চার জন্য উপজেলার একটি গণপাঠাগার অত্যন্ত প্রয়োজন। তিনি দ্রুত পাঠাগারটি চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। উপজেলা সদরের নতুনপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও স্কুলশিক্ষক বদিউল ইসলাম তার স্মৃতিচারণ করে বলেন, একসময় পাঠাগারটিতে পাঠকদের জমজমাট আসর বসত। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে বই ও পত্রিকা পড়তে আসতেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সেই দিনগুলো এখন শুধু স্মৃতি। জ্ঞান অর্জনের এমন সুযোগ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকাটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। ধরমপাশা সাহিত্য পরিষদের সভাপতি আনিসুল হক অভিযোগ করেন যে, এক যুগ ধরে পাঠাগারটি বন্ধ থাকলেও এটি চালু করার বিষয়ে কারও তেমন আগ্রহ নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পাঠাগার থেকে চুরি হওয়া বই ও আসবাবপত্র আজ পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি। প্রশাসনের নতুন উদ্যোগ তবে পাঠাগারটি আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় সম্প্রতি মুঠোফোনে জানান যে, সরকারি অর্থায়নে দুই সপ্তাহ আগে ওই গণপাঠাগারটির সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পাঠাগারটি চালুর জন্য খুব শিগগির শিক্ষক, রাজনৈতিক দলের নেতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সভা করা হবে। এছাড়াও পাঠাগারটির আনুষঙ্গিক যেসব সমস্যা রয়েছে, সেসব চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।