কাজী নজরুল ইসলাম মূলত তাঁর বিদ্রোহী কবিতার জন্য পরিচিত হলেও, তাঁর গদ্য রচনাও সময়, রাজনীতি, সাম্য এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। কথ্যভঙ্গি, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও জনতার প্রতি সরাসরি আহ্বানের মাধ্যমে গড়ে ওঠা তাঁর স্বতন্ত্র গদ্যভাষাই ‘নজরুলী গদ্য’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর সাহিত্যিক পরিচিতি মূলত কবিতার দ্বারা প্রভাবিত হলেও, গদ্যেও তিনি সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।

নজরুলের সাহিত্যিক যাত্রা শুরু হয়েছিল গদ্য রচনার মধ্য দিয়ে। ১৯১৯ সালে ‘সওগাত’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম গল্প ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’ প্রকাশিত হয়। ১৯২২ সালে তাঁর প্রথম বই ‘ব্যথার দান’ প্রকাশিত হয়, যা ছিল একটি ছোটগল্প সংকলন। একই বছর ‘বিদ্রোহী’ কবিতার পাশাপাশি ‘অগ্নি-বীণা’ ও ‘যুগ–বাণী’ও প্রকাশিত হয়। নজরুল নিজেও ‘আমার সুন্দর’ প্রবন্ধে তাঁর গদ্য রচনার গুরুত্ব স্বীকার করেছেন, উল্লেখ করেছেন যে তাঁর সুন্দর প্রথমে ছোটগল্প হয়ে এসেছিল।

সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

নজরুল ১৯২০ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে ‘নবযুগ’ (১৯২০), ‘ধূমকেতু’ (১৯২২) এবং ‘লাঙল’ (১৯২৬) পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এই সময়ে তিনি সম্পাদকীয় নিবন্ধে তাঁর চিন্তাভাবনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তাঁর গদ্যগুলো সেকালের বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ঔপনিবেশিক ভারতের ইতিহাসে তখন বঙ্গভঙ্গ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, খিলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন এবং পাকিস্তান প্রস্তাবের মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে। নজরুলের গদ্যে সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিত্র সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, যা ভারতীয় উপমহাদেশের পরিচয়ের রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতির অংশীজন হয়ে উঠেছে।

নজরুল তাঁর গদ্যে রাজনৈতিক ঐক্য গঠনের প্রস্তাবনা তুলে ধরেন, যেখানে তিনি হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের জন্য সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ আহ্বান জানান। তবে এটি তাঁর সম্প্রদায়গত পরিচয়কে ক্ষুণ্ণ করেনি; ‘বাংলা সাহিত্যে মুসলমান’ প্রবন্ধ এবং ‘তরুণের সাধনা’র মতো অভিভাষণে তিনি তাঁর মুসলমান পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। ১৯১৯ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম প্রবন্ধ ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’য় তিনি পশ্চিমা অপরায়ণের বিরুদ্ধে জোরালো জবাব দেন। তাঁর গদ্যে জাতীয় আন্দোলন ও অভিজাততন্ত্রের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন এবং ব্যুরোক্রেসির বিরুদ্ধে শাণিত ভাষা দেখা যায়। নজরুল আধ্যাত্মিক বা আত্মিক জাগরণের কথা বলেছেন, যাকে তিনি ‘আধ্যাত্মিকতার রাজনীতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ‘নবযুগ’ ধারণাটি ধর্ম, শ্রেণি ও জাতীয়তার সীমানা ভেঙে বিচ্ছিন্ন শক্তিগুলোকে একীভূত করার জাগরণকে নির্দেশ করে।

নজরুলী গদ্যের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব

বাংলা গদ্যের ইতিহাসে ‘নজরুলী গদ্য’ একটি স্বতন্ত্র স্থান দখল করে আছে। নজরুল ‘উচ্চারণ’কে বিশেষভাবে প্রাধান্য দিয়েছেন, যার ফলে তিনি তাঁর পাঠক ও জনতাকে সরাসরি সম্বোধন করে কথা বলেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন, “তুমি কি চাও—শৃঙ্খল, না স্বাধীনতা?” তিনি কথ্যভঙ্গি ব্যবহার করেছেন এবং সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, ইংরেজি, আঞ্চলিক, লৌকিক ও স্ল্যাং শব্দগুলোকে নির্বিচারে মিশিয়ে দিয়েছেন। নজরুলের গদ্য রবীন্দ্রনাথের তুলনায় কম বিমূর্ত এবং প্রমথ চৌধুরীর তুলনায় অনেক বেশি কথ্য। তাঁর সাধু গদ্যেও কথ্যের আস্বাদ পাওয়া যায়, যা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে পূর্ণ এবং শব্দ নিয়ে খেলার প্রবণতা দেখায়। নজরুলের গদ্যের তীব্রতার কারণে শাসকগোষ্ঠী তাঁর বই নিষিদ্ধ করার পথ বেছে নেয়। বাংলা সরকারের হাতে ‘যুগ-বাণী’, ‘দুর্দিনের যাত্রী’ এবং ‘রুদ্রমঙ্গল’ বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। যদিও কেউ কেউ তাঁর গদ্যে উচ্ছ্বাসের আতিশয্য এবং যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তার অভাবের অভিযোগ তুলেছেন, তবে নজরুলের মূল লক্ষ্য ছিল পাঠকের মনে চিন্তা তৈরি করা এবং উপনিবেশিত শরীর ও সত্তার মুক্তি কামনা করা। তাঁর গদ্যের এই শক্তি পুনঃপাঠ দাবি করে।