নেপাল-চীন সীমান্তে হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট একটি হ্রদে শুক্রবার পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে, যা ওই অঞ্চলে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। দুই দিন আগে আকস্মিক ভয়াবহ বন্যায় তছনছ হয়ে যাওয়া এলাকাগুলো আবারও বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পড়েছে। এই নতুন পরিস্থিতিতে কিছু সময়ের জন্য উদ্ধারকাজ বন্ধ রাখতে হয়। গত বুধবারের প্রলয়ঙ্করী বন্যায় নেপালে ৪৮৯ জন এবং চীনের তিব্বতে ৫ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া, দুই দেশ মিলিয়ে এখনো এক হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। হিমালয়ের পার্বত্য নদীব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বিশাল শিলাখণ্ড, বরফ, কাদা এবং ধ্বংসাবশেষের তীব্র স্রোত নেমে আসার সময় একটি হ্রদের সৃষ্টি হয়, যেখানে ক্রমাগত পানি জমতে থাকে। হ্রদের পানি উপচে পড়া ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া নেপাল কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শুক্রবার হ্রদের পানি উপচে ভোটেকোশি নদীতে পড়ার আগে এর জলাধারে পানির পরিমাণ ২৫ লাখ ঘনমিটার অতিক্রম করেছিল। নেপালের বন্যাদুর্গত রসুয়া জেলার শীর্ষ কর্মকর্তা নরেন্দ্র পরিয়ার রয়টার্সকে বলেন, "আমরা একটি নোটিশ পেয়েছি যে হ্রদের তীর ভেঙে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, নদীতে পানির স্তর বাড়ছে।" রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মাইকে সতর্কবার্তা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকজন নিজেদের জিনিসপত্র নিয়ে উঁচু স্থানের দিকে দৌড়াতে শুরু করেন। পুলিশ সদস্যরা রশি ও স্ট্র্যাচার নিয়ে প্রস্তুত ছিলেন। ৪০ বছর বয়সী শান্তি তামাং রয়টার্সকে বলেন, "সবাইকে 'পালাও' বলে সতর্ক করা শুরু হলে আমিও দৌড় দিলাম। বিদুর শহরের সাইরেনও বেজে উঠেছিল। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।" উদ্ধারকর্মীদেরও নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছিল। উদ্ধার অভিযান ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি শুক্রবার জানিয়েছে, হ্রদটির বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দিলে চীনের সব উদ্ধারকারী কর্মী ও যানবাহনকে নিরাপদ এলাকায় সরে যেতে বলা হয়। পরে "উজানের নদীর মাধ্যমে হ্রদের ঝুঁকিটি সামলানো সম্ভব বলে মনে হওয়ায়" উদ্ধারকাজ আবার শুরু হয়। নেপালের সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেছেন, নেপাল কর্তৃপক্ষ ৯০ মিনিটের জন্য উদ্ধার অভিযান স্থগিত রেখেছিল, পরে তা আবার শুরু হয়। বুধবারের বন্যায় গ্রাম ও উপত্যকাগুলো ধূলিসাৎ হয়ে গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাস্তাঘাট এবং সেতু ধ্বংস হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৮০০ বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যাঁদের অনেকেই ভারতের হিন্দু তীর্থযাত্রী। উদ্ধারকাজ পরিচালনার কৌশল নিয়ে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে শুক্রবার চীনের পলিটব্যুরো বৈঠক করেছে। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় "বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি" এবং "নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে সর্বাত্মক চেষ্টা" চালানোর আহ্বান জানানো হয়। বৈঠকে হিমবাহ হ্রদ, পাহাড়ধসের ঝুঁকি এবং প্রাকৃতিক বাঁধের নজরদারি জোরদার করা, নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জরুরি সহায়তা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক দুর্যোগ সহযোগিতা সুদৃঢ় করার আহ্বান জানানো হয়। চীনের দ্বিতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং গতকাল বিকেলে গিরোংয়ের দুর্যোগকবলিত এলাকায় পৌঁছান, যা এই দুর্যোগে চীনের গুরুত্ব প্রমাণ করে। চারদিক থেকে সাহায্যের প্রস্তাব এলেও নেপাল জানিয়েছে, তাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে অন্য কোনো দেশের সাহায্যের প্রয়োজন নেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী শুক্রবার বলেন, "সাহায্যের প্রস্তাব আসাটাই স্বাভাবিক, তবে আমাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোই অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। আপাতত আমাদের এই ধরনের সাহায্যের প্রয়োজন নেই।" দক্ষিণ কোরিয়ার একটি র্যাপিড রেসপন্স টিম কাঠমান্ডুতে অবস্থান করলেও, নেপাল সরকার বিদেশি উদ্ধারকারীদের সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা না করায় তাদের মোতায়েন করা হয়নি। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ তাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলগুলোকে অভিযানে সহায়তা করার অনুমতি দিতে সরকারকে অনুরোধ করেছিল। বিশ্বজুড়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা তাঁদের প্রিয়জনদের অবস্থান জানতে ব্যাকুল হয়ে আছেন।