১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপাল কাজী নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্‌দীনের এক বিরল সাক্ষাৎ ঘটে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি একটি আলোকচিত্রে ধারণ করা হয়, যা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দুই মহিরুহের শেষ যুগল উপস্থিতির একমাত্র দৃশ্যমান দলিল হিসেবে বিবেচিত। দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকলেও, মানবিক আবেগ ও বন্ধুত্বের টানে এই অসাধারণ ঘটনাটি সম্ভব হয়েছিল। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবার কলকাতা থেকে ঢাকায় আনা হয়। এরপর থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা চলছিল এবং তিনি পিজি হাসপাতালের একটি বিশেষ কেবিনে অবস্থান করছিলেন। একই সময়ে, কবি জসীমউদ্‌দীনও অসুস্থ হয়ে একই হাসপাতালের পাশের একটি কেবিনে ভর্তি ছিলেন। প্রশাসনিক বিধিনিষেধের কারণে তাঁদের স্বাভাবিক সাক্ষাৎ সহজ ছিল না, যদিও তাঁরা একই করিডরে ছিলেন। ঐতিহাসিক আলোকচিত্র ধারণ এই পরিস্থিতিতে একজন তরুণ আলোকচিত্রী দুই কবিকে একসঙ্গে ক্যামেরাবন্দী করার একটি সাহসী পরিকল্পনা করেন। তিনি জসীমউদ্‌দীনের কাছে তাঁর ইচ্ছার কথা জানান এবং সহযোগিতা কামনা করেন। জসীমউদ্‌দীন কিছুক্ষণ নীরব চিন্তার পর হাসপাতালের কয়েকজন সহায়কের সাহায্যে কাজী নজরুল ইসলামকে ধীরে ধীরে তাঁর নিজের কেবিনে নিয়ে আসেন। এটি কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং সম্পূর্ণ মানবিক আবেগ ও আন্তরিকতার প্রকাশ ছিল। দুই কবি মুখোমুখি হলে জসীমউদ্‌দীন আবেগাপ্লুত হয়ে বিদ্রোহী কবির হাত নিজের দুই হাতে তুলে নেন। তাঁর কণ্ঠ কেঁপে ওঠে— ‘কাজীদা, আমি জসীম… কাজীদা, আমি জসীম।’ কাজী নজরুল ইসলাম স্থির দৃষ্টিতে জসীমউদ্‌দীনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। দীর্ঘ অসুস্থতা তাঁর বাক্‌শক্তি কেড়ে নিলেও, তাঁর চোখ দুটি তখনো গভীর অনুভূতির ভাষা জানত। সেই দৃষ্টিতে ছিল বিস্ময়, পরিচয়ের ক্ষীণ আলো, স্নেহ, নীরবতা ও সময়ের নির্মমতা। শব্দহীন সেই কয়েকটি সেকেন্ডে দুই কবির মধ্যে যে সংলাপ ঘটেছিল, তা ভাষায় সম্পূর্ণ ধারণ করা সম্ভব নয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই আলোকচিত্রী শাটার চাপেন এবং ঐতিহাসিক ছবিটি ধারণ করেন। ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতি ও জসীমউদ্‌দীনের ভূমিকা আলোকচিত্রটি ধারণের পরপরই হাসপাতালের পরিবেশ বদলে যায়। খবর পেয়ে দ্রুত সেখানে উপস্থিত হন পিজি হাসপাতালের পরিচালক, প্রখ্যাত চিকিৎসক নূরুল ইসলাম। তিনি নজরুলের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, কারণ হাঁটিয়ে আনার কারণে কবির রক্তচাপ কিছুটা বেড়ে গিয়েছিল। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে আলোকচিত্রীকে ভর্ৎসনা করতে শুরু করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে জসীমউদ্‌দীন নিজেই সামনে এগিয়ে এসে শান্ত কণ্ঠে বলেন— ‘কবিকে আমিই নিয়ে এসেছি। এর দায় আমার।’ এই একটি মাত্র বাক্যেই পরিবেশ শান্ত হয়ে যায়। ডা. নূরুল ইসলাম আর কিছু না বলে চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করেন, আর জসীমউদ্‌দীন পালন করেন বন্ধুত্বের দায়িত্ব। আলোকচিত্রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এই আলোকচিত্রটি কেবল একটি প্রতিকৃতি নয়, এটি সময়ের বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম এবং এমন এক দৃশ্য যেখানে ভাষা স্তব্ধ হলেও ইতিহাস কথা বলে। আলোকচিত্রী অনুভব করেছিলেন যে, এই ক্ষুদ্র নেগেটিভে সংরক্ষিত দৃশ্যটি একদিন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমূল্য দৃশ্যমান দলিল হয়ে উঠবে। ভবিষ্যতের গবেষক, পাঠক ও ইতিহাসবিদেরা যখন নজরুল ও জসীমউদ্‌দীনের সম্পর্কের কথা বলবেন, তখন এই আলোকচিত্র ইতিহাসের নীরব সাক্ষ্য হিসেবে তাঁদের সামনে উপস্থিত হবে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্‌দীন—এই দুই কবির অবস্থান যেন একই আকাশের দুটি ভিন্ন নক্ষত্র। একজন বিদ্রোহ, মানবমুক্তি ও সাম্যের জাগরণকে কাব্যের ভাষা দিয়েছেন; অন্যজন বাংলার পল্লিজীবন, লোকসংস্কৃতি ও সাধারণ মানুষের অনুভূতিকে বিশ্বসাহিত্যের মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। তাঁদের সাহিত্যিক স্বর ভিন্ন হলেও বাংলা জাতিসত্তা নির্মাণে তাঁরা পরস্পরের পরিপূরক।