প্রথম ছয় মাসে বিএনপির চরম ব্যর্থতার দাবি জামায়াতের

ঢাকা-র মগবাজারে অবস্থিত আল-ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী-র সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসের মেয়াদকালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। দলটির দাবি অনুযায়ী, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার অভাব এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ব্যর্থতাসহ মোট ১২টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের পর গঠিত এই সরকারের মূল্যায়ন তুলে ধরে জামায়াত নেতা বলেন যে, নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্ন জনগণ জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেখেছিল, তা বর্তমান সরকারের ভুল নীতির কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

জ্বালানি সংকট ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের মহাসচিব বলেন, দেশে দৈনিক ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২,৭০৩ থেকে ২,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা শিল্প কারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সাধারণ গ্রাহকদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। জুলাই মাসে দেশীয় উৎপাদন থেকে দৈনিক ১,৬৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মিললেও উৎপাদন বাড়াতে সরকারের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। অন্যদিকে দেশের অর্থনীতি ও বাজার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, দেশে বর্তমানে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.৬৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৬১ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও দলীয়করণের গুরুতর অভিযোগ

জামায়াত-ই-ইসলামী অভিযোগ করেছে যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সিটি করপোরেশনগুলোতে যোগ্যতা ও মেধার মূল্যায়ন না করে কেবল শাসক দলের পদমর্যাদাকে প্রাধান্য দিয়ে স্বজনপ্রীতি করা হচ্ছে। ছাত্রদল, যুবদল এবং প্রধান রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের অন্তত ১১টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড, ২৯৪টি ডাকাতি, ১৯৪টি অপহরণ এবং ৩,৪১৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। মে মাস পর্যন্ত এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ড, ৪৬১টি ডাকাতি, ২৮৬টি অপহরণ, ৩,২৭৭টি চুরি এবং ৫,৪৪৮টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর অবস্থা ও বৈদেশিক নীতিতে স্থবিরতা

দেশের আর্থিক খাতের নাজুক পরিস্থিতি উল্লেখ করে বলা হয়, মার্চ মাস শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫,৮৮,৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরিত ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ ৩১,৪২৭ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতার পেছনে ইসলামিক ব্যাংকে সরকারের অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপকে দায়ী করা হয়। বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে “বাংলাদেশ ফাস্ট” নীতি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দ্বি-পাক্ষিক ইস্যুগুলো এখনো সমাধানহীন অবস্থায় রয়ে গেছে। শিক্ষাক্রম, কৃষি খাতের সার সংকট, বিচার বিভাগ এবং স্বাস্থ্য খাতের দুর্বল পারফরম্যান্সের কারণেও সরকারের তীব্র সমালোচনা করা হয়। তবে ইতিবাচক দিক হিসেবে জামায়াত নেতা বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্থিতিশীলতা এবং জ্বালানি সংকট সমাধানে বিরোধী দলের প্রস্তাব অনুসরণে গঠিত সংসদীয় কমিটির পদক্ষেপের প্রশংসাও করেন।

#রাজনীতি #বাংলাদেশ #অর্থনীতি #সংবাদ