জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক এবং কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে দেওয়া তাঁর বক্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছেন। শনিবার দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্টের মাধ্যমে তিনি এই দুঃখপ্রকাশ করেন। তাঁর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় তিনি বিব্রত বলে জানিয়েছেন। হাসনাত আবদুল্লাহ উল্লেখ করেছেন যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবদিহি চেয়ে সংসদে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হওয়ায় তিনি দুঃখিত। তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছিলেন যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা, সিনেমা অনেকটা নিষিদ্ধের মতোই। হাসনাতের মতে, এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন এবং সেখানকার আলেম-ওলামাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন।
সংসদে হাসনাতের বক্তব্য ও ব্যাখ্যা
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে হাসনাত আবদুল্লাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে একটি সম্পূরক প্রশ্ন করেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা ও নৌকাবাইচ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তিনি পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখতে পেরেছেন কি না।
ফেসবুক পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের কনসার্ট বন্ধ হওয়ার খবর গণমাধ্যমে ভিন্নভাবে এসেছিল। গভীর রাতে উচ্চশব্দের কারণে মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটায় শিক্ষার্থীরা শব্দ কমাতে অনুরোধ করে। এ নিয়ে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি থেকে ঘটনা ঘটে এবং কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হন। হাসনাতের মতে, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা কনসার্ট বন্ধ করে দেয়নি, তারা কেবল শব্দ কমাতে বলেছিল। এর অর্থ এই নয় যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। নৌকাবাইচের বিষয়ে তিনি তাঁর তথ্যগত ত্রুটির কথা স্বীকার করেছেন, সিলেটের জায়গায় ভুলবশত ব্রাহ্মণবাড়িয়া বলে ফেলেছিলেন। এই ত্রুটির কারণে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝিতে তিনি বিব্রত এবং দুঃখপ্রকাশ করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সম্পূরক প্রশ্নে সময় সীমাবদ্ধতার কারণে সংসদে বিস্তারিত বলার সুযোগ ছিল না।
সরকারের দায়িত্ব ও হাসনাতের প্রত্যাশা
হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর পোস্টে একটি সর্বজনীন সমাজের স্বপ্ন ব্যক্ত করেছেন, যেখানে সকল মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে এবং কেউ কারও মত অন্যের ওপর চাপিয়ে দেবে না। তিনি বলেন, যদি কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও ওপর জোর খাটায়, তবে সরকারের দায়িত্ব তা প্রতিহত করে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করা। সরকারের এই দায়িত্ব পালনে দ্বিধা আইনশৃঙ্খলা ভেঙে দেয় এবং সরকারের ব্যর্থতা প্রমাণ করে। হাসনাতের মতে, এই বাংলাদেশ সবার, যেখানে মসজিদ, মন্দির, সঙ্গীত, ওয়াজ, মাজার, কনসার্ট, মাহফিল, রথযাত্রা, সিনেমা উৎসব এবং আলেমদের আলোচনা সবই থাকবে। তিনি এই দেশকে সব ধর্ম ও মতের মিলনস্থল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর প্রত্যাশা, সরকার নিশ্চিত করবে যেন কেউ আরেকজনের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে না পারে। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে সরকার সেই নিরাপত্তা দিতে পারছে না, যার ফলে সমতার বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে ক্ষতি হচ্ছে।
ক্ষমা চাওয়ার প্রেক্ষাপট
হাসনাত আবদুল্লাহর সংসদীয় বক্তব্যের প্রতিবাদে গত শুক্রবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ বিক্ষোভ মিছিল করে। তারা হাসনাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেয় এবং তাঁর বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানায়। ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় এনসিপির কোনো কর্মসূচি হতে দেওয়া হবে না বলেও তারা ঘোষণা দেয়। এসব প্রতিবাদ ও সমালোচনার প্রেক্ষিতেই হাসনাত আবদুল্লাহ ফেসবুকে দুঃখপ্রকাশ করেন। এনসিপির পক্ষ থেকেও হাসনাতের দুঃখপ্রকাশের বিষয়টি শেয়ার করে তা প্রচারের অনুরোধ জানানো হয়েছে।