শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘পথের দাবী’ প্রকাশের শতবর্ষ পরেও প্রাসঙ্গিক। বইটি শুধু পাঠকের মনে আলোড়নই তোলেনি, কাঁপিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত। বিপ্লব, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় রচিত এই উপন্যাসটি শেষ পর্যন্ত ঔপনিবেশিক সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়েছিল।
উপন্যাসের প্রকাশ ও ব্রিটিশ সরকারের উদ্বেগ
ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারতে অহিংস জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও বিপ্লবী তৎপরতা বিদ্যমান ছিল। এই পটভূমিতে শরৎচন্দ্র এমন এক উপন্যাস লিখলেন, যার মূল বার্তা ছিল মানবমুক্তির ঝান্ডা তুলে ধরা। লেখক প্রথমে পাণ্ডুলিপি ফেলে রাখলেও, উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সেটি বঙ্গবাণী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। ১৩২৯ বঙ্গাব্দ থেকে শুরু হয়ে ১৯২৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে শেষ কিস্তি ছাপা হয়। একই বছরের ৩১ আগস্ট তিন টাকা মূল্যে বইটি আত্মপ্রকাশ করে। প্রকাশের এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রথম সংস্করণের প্রায় সব কপি (৩-৫ হাজার) বিক্রি হয়ে যায়। এই ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা শাসকগোষ্ঠীর উদ্বেগের কারণ হয়, ফলে পুলিশ বাজেয়াপ্ত করতে গিয়ে বাজারে কপি পায়নি।
বিষয়বস্তু ও সরকারি নিষেধাজ্ঞা
‘পথের দাবী’র কেন্দ্রীয় চরিত্র সব্যসাচী মল্লিক একজন বিপ্লবী, যিনি চিকিৎসা ও প্রকৌশলবিদ্যায় পারদর্শী ও ছদ্মবেশে চলাচলে দক্ষ। গবেষক তনিকা সরকার সব্যসাচীকে বাংলা কথাসাহিত্যের ‘সুপারম্যান’ চরিত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সব্যসাচী সমকালীন বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ও লেখকের কল্পনার সম্মিলিত রূপ। শরৎচন্দ্র নিজেও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি ‘পথের দাবী’ বাজেয়াপ্ত করা হয়। অভিযোগ ছিল, উপন্যাসটি পাঠকের মধ্যে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বা রাজদ্রোহের মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে। একই সময়ে জে টি সান্ডারল্যান্ডের ‘ইন্ডিয়া ইন বন্ডেজ’ বইটিও ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে। শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, তিনি শুধু বই লিখেছেন, পাঠকের মন অপ্রসন্ন হলে দায় লেখকের নয়। তাঁর উক্তি ছিল:
‘‘ইংরাজশক্তির এই বই বাজেয়াপ্ত করবার জাস্টিফিকেশন যদি থাকে, পরাধীন ভারতবাসীর প্রোটেস্ট করবার জাস্টিফিকেশনও তেমনি আছে।’’
রবীন্দ্রনাথের মতামত ও নিষেধাজ্ঞার অবসান
নিষেধাজ্ঞার পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত জানতে চাইলে তাঁদের মধ্যে চিঠি-বিনিময় হয়। রবীন্দ্রনাথের মতে, বইটি উত্তেজক ছিল, তাই শাসকের প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত। তাঁর উক্তি:
‘‘বইখানি উত্তেজক। অর্থাৎ ইংরেজের শাসনের বিরুদ্ধে পাঠকের মনকে অপ্রসন্ন করে তোলে। লেখকের কর্তব্য হিসেবে সেটা দোষের না–ও হতে পারে। কারণ, লেখক যদি ইংরেজরাজকে গর্হণীয় মনে করেন, তা হলে চুপ করে থাকতে পারেন না। কিন্তু চুপ করে না থাকার যে বিপদ আছে, সেটুকু স্বীকার করাই চাই।’’
নিষেধাজ্ঞা প্রায় এক যুগ বহাল ছিল। শরৎচন্দ্র ১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর এক বছর পর ১৯৩৯ সালের ১ মার্চ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
ব্রিটিশ সরকার যে বইকে একদিন বাজেয়াপ্ত করেছিল, সেটি এখন ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্রযন্ত্র তার প্রচার বন্ধ করলেও, মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। শরৎচন্দ্র তাঁর বইয়ের ‘মুক্তি’ দেখে যেতে পারেননি। বইটি পাঠকের হাত ঘুরে ঘুরে বিপ্লবের প্রেরণা জুগিয়েছিল এবং সাহিত্যের অদম্য শক্তিকে প্রমাণ করেছিল।