ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল নারায়ণগঞ্জ সদর ভূমি অফিস পরিদর্শনে গিয়ে নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতি এবং হাজিরা খাতায় একাধিক কর্মকর্তার আগাম স্বাক্ষর দেখতে পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি এই ঘটনাকে ‘জালিয়াতি’ হিসেবে উল্লেখ করে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারি দপ্তরে সময়মতো উপস্থিত না হওয়া এবং জনগণের ভোগান্তি নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই আকস্মিক পরিদর্শন পরিচালিত হয়।

সোমবার সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল আকস্মিকভাবে নারায়ণগঞ্জ সদর ভূমি অফিসে পৌঁছান। সকাল ৯টা পর্যন্ত পরিদর্শনের সময় তিনি অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কার্যালয়ে উপস্থিত পাননি। একই কমপ্লেক্সে নারায়ণগঞ্জ সদর রাজস্ব সার্কেল, ফতুল্লা এবং সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের কার্যালয় অবস্থিত। প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শনের সময় এই দুটি সার্কেল অফিসে সহকারী কমিশনার (ভূমি), কানুনগোসহ অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী অনুপস্থিত ছিলেন।

হাজিরা খাতায় আগাম স্বাক্ষর ও প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ

পরিদর্শনের সময় প্রতিমন্ত্রী হাজিরা খাতায় কর্মকর্তাদের আগাম স্বাক্ষর দেখতে পান। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান যে, সরকারি কার্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়মতো উপস্থিত না হওয়া এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিয়ে তাঁর কাছে অনেক অভিযোগ আসছে। তিনি উল্লেখ করেন, দুটি সার্কেল অফিসের ৩১ আগস্টের হাজিরা খাতায় সবার স্বাক্ষর থাকলেও, তারা কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না।

এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। হাজিরা বইয়ে স্বাক্ষর আছে, কিন্তু তাঁরা হাজির ছিলেন না। এটা জালিয়াতি। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব হলো সময়মতো অফিসে এসে জনগণকে সেবা দেওয়া। মানুষ তাদের প্রাপ্য সেবা পাওয়ার জন্য সরকারি দপ্তরে আসেন। তাই সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার মানসিকতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। তিনি সরকারি ভূমিসেবা আরও স্বচ্ছ, গতিশীল ও জনবান্ধব করতে নিয়মিত তদারকি অব্যাহত রাখার কথা জানান।

নদী ও জমির রেকর্ড সংক্রান্ত জটিলতা

পরিদর্শনের সময় নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) রিনাত ফৌজিয়া ভূমি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন জটিলতার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত করেন। তিনি জানান যে, সিএস জরিপে অনেক জায়গা নদী, খাল ও বিল হিসেবে চিহ্নিত থাকলেও পরবর্তী আরএস জরিপে সেসব স্থানে নদীর অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানাও সৃষ্টি হয়েছে। পুরোনো সিএস রেকর্ডের কারণে এসব জমির নামজারি এবং ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।

রিনাত ফৌজিয়া আরও বলেন, নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদী ঘিরে এ ধরনের জটিলতা বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। এই বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি। নদী রক্ষা কমিশনের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) পাওয়ার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন জটিলতা বিদ্যমান। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এসব জটিলতার স্থায়ী সমাধানের জন্য উচ্চতর আদালতের নির্দেশনা প্রয়োজন বলে মত দেন। একই সঙ্গে তিনি ভূমি অফিসগুলোতে জনবলসংকটের বিষয়টি তুলে ধরেন।

সমাধানের আশ্বাস ও তদারকি

জবাবে ভূমি প্রতিমন্ত্রী মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে এ বিষয়ে একটি কর্মশালা আয়োজনের আশ্বাস দেন। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মীর হেলাল পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, জনগণকে সেবা দেওয়াই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রধান দায়িত্ব। রাষ্ট্র তাদের জনগণের সেবা করার জন্য এই দায়িত্ব অর্পণ করেছে। তাই দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের গাফিলতি বা অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না। সরকারি ভূমিসেবা আরও স্বচ্ছ, গতিশীল ও জনবান্ধব করতে নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।