আড়াই শতকের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্র খুব কম সময়ই যুদ্ধের বাইরে ছিল। স্বাধীনতাযুদ্ধ থেকে শুরু করে গৃহযুদ্ধ, দুটি বিশ্বযুদ্ধ এবং কোরীয় যুদ্ধ—প্রতিটি রক্তক্ষয়ী সংঘাত দেশটির রাজনীতি, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অবস্থানকে নতুনভাবে গড়ে দিয়েছে। তবে এর পেছনে দেশটিকে বিপুল মূল্যও দিতে হয়েছে। লাখো মানুষের প্রাণহানি, কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয়—সব মিলিয়ে এসব যুদ্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক মূল্য ছিল নজিরবিহীন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল ১৭৭৫ সালের ১৯ এপ্রিল ম্যাসাচুসেটসের লেক্সিংটন ও কনকর্ডে ব্রিটিশ সেনা ও উপনিবেশগুলোর মিলিশিয়াদের মধ্যে গোলাগুলির মাধ্যমে, যা দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধের জন্ম দেয়। ১৭৮৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্যারিস চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে এর অবসান ঘটে। কর আরোপ ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিরোধ থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতাযুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। আমেরিকান ব্যাটলফিল্ড ট্রাস্টের হিসাবে, এ যুদ্ধে ৬ হাজার ৮০০ মার্কিন যোদ্ধা নিহত, ৬ হাজার ১০০ জন আহত ও ২০ হাজারের বেশি বন্দী হন। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের গোলাগুলির চেয়ে রোগে মারা যান অন্তত ১৭ হাজার মার্কিন। ইতিহাসবিদ মাইকেল প্যাট্রিক কালিনেনের মতে, তৎকালীন ২৫ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ মানুষ এ যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিল, যা একটি নবীন রাষ্ট্রের জন্য ছিল বিরাট ক্ষতি। গৃহযুদ্ধ: মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত স্বাধীনতার যুদ্ধ যদি যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম দেয়, গৃহযুদ্ধ দেশটিকে প্রায় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। ১৮৬১ সালের ১২ এপ্রিল সাউথ ক্যারোলাইনার চার্লসটন বন্দরের ফোর্ট সামটারে গোলাবর্ষণ শুরু করে কনফেডারেট বাহিনী, যা চার বছরের গৃহযুদ্ধের সূচনা করে। দাসপ্রথা বজায় রাখা ও অঙ্গরাজ্যগুলোর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ১১টি দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গিয়ে ‘কনফেডারেট স্টেটস অব আমেরিকা’ গঠন করে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এ যুদ্ধে প্রথমবারের মতো লৌহবর্মে মোড়া যুদ্ধজাহাজ, টেলিগ্রাফ, রেলপথ, কার্যকর মেশিনগান ও সাবমেরিন ব্যবহৃত হয়। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এ যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা ৬ লাখ ২০ হাজার বলা হলেও, গবেষকদের সংশোধিত হিসাবে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৫২ হাজার থেকে ৮ লাখ ৫১ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। মার্কিন ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরীয় যুদ্ধ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মোট প্রাণহানির চেয়েও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন এ এক যুদ্ধেই। ইউনিয়ন ও কনফেডারেসি—দুই পক্ষ মিলিয়ে যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৬ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র টিকে থাকার মৌলিক প্রশ্ন এবং দাসপ্রথার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়। দুই বিশ্বযুদ্ধ ও কোরীয় সংঘাতের মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র দেরিতে যোগ দিলেও, ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘জিমারম্যান টেলিগ্রাম’ এবং আটলান্টিক মহাসাগরে জার্মানির নির্বিচার সাবমেরিন হামলা দেশটির জনমতকে যুদ্ধের পক্ষে নিয়ে যায়। ২ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন কংগ্রেসে বলেন, বিশ্বকে গণতন্ত্রের জন্য নিরাপদ করে তুলতে হবে। চার দিন পর জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। যুদ্ধে অংশ নেওয়া ৪৭ লাখ মার্কিন সেনার মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার ৫১৬ জন নিহত হন এবং প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার আহত বা অসুস্থ হন। যুদ্ধক্ষেত্রের লড়াইয়ের চেয়ে ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারিতেই বেশি মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছিল। এ যুদ্ধের পর জার্মানি, রাশিয়া, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও তুরস্ক—এ চার সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শুরু হয় ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবার নৌঘাঁটিতে জাপানের আকস্মিক হামলার মাধ্যমে, যেখানে ২ হাজার ৪০০–এর বেশি মানুষ নিহত হন। এরপর মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ২ লাখের কম থেকে ১ কোটি ১০ লাখের বেশি হয়।