রংপুরের মেছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের হত্যাকাণ্ড নাগরিকদের মধ্যে নতুন করে ভয় ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এই ভয়াবহ ঘটনার কারণ নিয়ে পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য জনমনে সংশয় ও প্রশ্ন তৈরি করেছে। এর ফলে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নাগরিকদের নিরাপত্তাবোধ নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নাগরিক নিরাপত্তা প্রধান উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের শুরুতেই বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়টিকে রেখেছিল। তবে গত ছয় মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেওয়া পদক্ষেপগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি এবং নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফেরানোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েই গেছে। রংপুরের হত্যাকাণ্ড ও জনমনে উদ্বেগ গত সপ্তাহে রংপুরের মেছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এই ঘটনা নাগরিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ভয়ের জন্ম দিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য ভুক্তভোগী পরিবার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। এই রকম একটি সংবেদনশীল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভাষ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে পুলিশ কতটা পেশাদারত্ব বজায় রাখতে পেরেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রংপুরের এই ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ছয় মাসে একই পরিবারের একাধিক সদস্য খুনের ঘটনা ঘটেছে ১৮টি, যেখানে মোট ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৪টি ঘটনা ঘটেছে নিজেদের বাড়ি বা ঘরের মধ্যে, যেখানে শিশুরাও খুনিদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। ঘর বা আবাসস্থল মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত হলেও, সেখানেই একেকটা পরিবারের একাধিক সদস্য খুন হচ্ছেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই এসব খুন গোটা সমাজেই নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করে। অপরাধ বৃদ্ধির কারণ ও মাদকের বিস্তার খুনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এর পেছনে মাদকাসক্তি, সম্পত্তি বা জমির বিরোধ এবং দাম্পত্য বা পারিবারিক কলহের মতো কারণগুলো জড়িত। রংপুরের চার খুনে গ্রেপ্তার সন্দেহভাজন দুই আসামি মাদকাসক্ত বলে পুলিশ জানিয়েছে। লক্ষ্মীপুরের হত্যাকাণ্ডে জড়িত যুবকও ছিলেন মাদকাসক্ত। সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তির মহামারি নিয়ে এক প্রতিবেদনে শিরোনাম করেছিল, ‘এই জিনিসটা মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়’। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খুন, ছিনতাই, রাহাজানি, ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধ বেড়ে যাওয়ার পেছনে ইয়াবাসহ সিনথেটিক মাদকের বিস্তারকে একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘ অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার মতো ভয়ংকর মাদক অবাধে প্রবেশ করছে। নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে মাদক প্রবেশের উৎসমুখ বন্ধ না করে এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী না করে কেবল মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা অর্থহীন প্রমাণিত হতে বাধ্য। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সরকারের দায়িত্ব রংপুরের আলোচিত চার খুনের কারণ নিয়ে জনমনে যে সংশয় ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমেই পুলিশকে সুরাহা করতে হবে। যৌক্তিক সময়ের মধ্যে যৌক্তিকভাবে তদন্ত শেষ করে দোষী ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করাই আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম সাত মাসের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে খুনের সংখ্যা বেড়েছে। ধর্ষণ, নারী নির্যাতনসহ অন্যান্য অপরাধের লেখও ঊর্ধ্বমুখী। ঘর বা আবাসস্থলে একের পর এক ভয়ংকর খুন নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করছে, যা প্রশমনের দায়িত্ব সরকারের। সরকারকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে নাগরিকেরা ঘরে-বাইরে সবখানেই নিরাপদ বোধ করতে পারেন।