অধ্যাপক জন রওলসের 'আ থিওরি অব জাস্টিস' গ্রন্থে উপস্থাপিত 'অজ্ঞতার পর্দা' এবং 'পার্থক্য নীতি' একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের ধারণাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। এই তত্ত্ব সমাজের মৌলিক কাঠামো এবং সম্পদ ও সুযোগের ন্যায্য বন্টন নিয়ে প্রশ্ন তোলে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গভীর তাৎপর্য বহন করে। রওলস আমাদের এমন একটি অবস্থা কল্পনা করতে বলেন যেখানে প্রত্যেকে নিজেদের সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক অবস্থা বা পারিবারিক পটভূমি সম্পর্কে কোনো জ্ঞান ছাড়াই সমাজের নিয়ম তৈরি করে। এই পরিস্থিতিতে, মানুষ নিজেদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এমন নিয়ম বেছে নেবে যা সমাজের প্রতিটি সদস্যের জন্য ন্যায্য ও সুবিচারপূর্ণ। রওলসের 'জাস্টিস অ্যাজ ফেয়ারনেস' তত্ত্ব সমাজের প্রাথমিক শর্তগুলো ন্যায্য কিনা, তা মূল্যায়নের একটি শক্তিশালী কাঠামো দেয়। তাঁর মূল উদ্বেগ ছিল, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজের সবার প্রতি, বিশেষ করে সবচেয়ে বঞ্চিতদের প্রতি ন্যায্য আচরণ করছে কিনা। আমরা প্রায়শই বৈষম্যকে কেবল ব্যক্তিগত প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রম ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল হিসেবে দেখি। এটি একটি মৌলিক সত্যকে উপেক্ষা করে: মানুষ একই সূচনালাইন থেকে জীবন শুরু করে না। উদাহরণস্বরূপ, একই দিনে জন্ম নেওয়া দুই শিশুর কথা ভাবুন। একজন ধনী পরিবারে সেরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সুযোগ পায়; অন্যজন দরিদ্র পরিবারে মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য সংগ্রাম করে। তাদের শুরুর শর্তগুলো ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুযোগের সমতা ও বৈষম্যের নীতি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর গভীর তাৎপর্য রয়েছে। যদি কোনো শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে জন্মায় বা বিপুল সম্পদের মধ্যে, দুটিই জন্মগত দৈবঘটনা। এই দৈবঘটনাগুলো শিক্ষাগত অর্জন, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, আয় এবং এমনকি রাজনৈতিক প্রভাবকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। রওলসের সুযোগের ন্যায্য সমতা ধারণাটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবে, ডাক্তার বা উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ প্রায়শই মা-বাবার সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা বা যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে। একটি সত্যিকারের ন্যায্য সমাজকে তাই মানুষের জীবন শুরুর শর্তগুলোর প্রতি মনোযোগী হতে হবে। রওলসের বিখ্যাত পার্থক্য নীতির মূল কথা হলো, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য তখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে যখন তা সমাজের সবচেয়ে বঞ্চিত সদস্যদের সর্বাধিক কল্যাণে কাজ করে। অর্থাৎ, রওলস বৈষম্য দূর করতে বলেন না, বরং জিজ্ঞাসা করেন যে বৈষম্যকে সমাজের নিচের স্তরে থাকা মানুষের কাছে ন্যায্য বলে প্রমাণ করা যায় কিনা। যদি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পদকে কেন্দ্রীভূত হতে দেয় এবং দরিদ্রতম মানুষেরা অপর্যাপ্ত শিক্ষা, দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা ও অনিরাপদ কর্মসংস্থানের মধ্যে আটকে থাকে, তবে সেই ব্যবস্থা অন্যায্য। একই নীতি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যখন শিক্ষার মান মা-বাবার আয়ের ওপর নির্ভর করে, তখন সে সমাজের সুযোগকে সত্যিকার অর্থে সমান বলা যায় না। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। মা-বাবা যে শিশুর সেরা চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারেন, তার জীবন শুরু হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন সম্ভাবনার পরিসর নিয়ে, যা সেই শিশুর থেকে ভিন্ন, যার পরিবার মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার খরচও বহন করতে পারে না। ন্যায্যতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ কোনো সমাজ এই পার্থক্যগুলোকে উপেক্ষা করতে পারে না। অর্থনৈতিক বৈষম্য শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বৈষম্যে পরিণত হয়। যখন সম্পদ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং উন্নত সুযোগের বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ধনীরা প্রবেশাধিকার কিনে নিতে পারে, তখন তারা এমন সুবিধা অর্জন করে যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজেদের পুনরুৎপাদন করে। রওলসের তত্ত্ব আমাদের এক গভীর প্রশ্ন করতে বাধ্য করে: আমরা যদি না জানতাম কোন পরিবারে আমাদের জন্ম হবে, তবে কি আমরা আমাদের সমাজের বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলো মেনে নিতাম? যদি উত্তর 'না' হয়, তবে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার প্রয়োজন।