ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রায় দশ মিনিট সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিরোধী দলের সদস্যদের আপত্তি, হইচই ও হট্টগোলে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদের ভবিষ্যৎ এবং কিছু সংসদ সদস্যের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এই ঘটনা সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা এবং সংসদীয় রীতির প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সংসদে উত্তাপের সূত্রপাত

বৃহস্পতিবারের ঘটনার সূত্রপাত হয় প্রশ্নোত্তর পর্বে। বাংলাদেশ জামাত ইসলামী দলের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ একটি সম্পূরক প্রশ্ন করতে গিয়ে অভিযোগ করেন, দিনদুপুরে ছিনতাই ও সংসদ সদস্যদের ওপর হামলা হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কেন্দ্র করে ভুয়া স্লোগান দেওয়া হচ্ছে এবং মিথ্যা মামলায় বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তিনি এসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদক্ষেপ জানতে চান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রশ্নটি পুনরায় করার অনুরোধ করেন। শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রশ্নটি পুনরায় করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শাহবাগ স্কয়ারে বক্তৃতা দেওয়া আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেওয়া এক কথা না।’ এই মন্তব্যে বিরোধী দলের সদস্যরা তীব্র আপত্তি জানান এবং প্রতিবাদ করতে থাকেন। শফিকুল ইসলাম মাসুদের প্রশ্নের জবাবের পর বিরোধী দলের সদস্যরা আরও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ত্রয়োদশ সংসদের শুরু থেকেই সবাইকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন।

বিতর্ক, প্রতিক্রিয়া ও স্পিকারের ভূমিকা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সারকথা ছিল যে, সংসদ পল্টন ময়দান বা শাহবাগ স্কয়ার নয়, এখানে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করতে হবে। বিরোধী দলের প্রশ্নকে ‘শাহবাগ স্কয়ার’ বা ‘পল্টনের বক্তৃতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা সংসদ সদস্যদের অবমূল্যায়ন কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। স্পিকার বলেছেন, কার্যবিবরণী পরীক্ষা করে অসংসদীয় কিছু পাওয়া গেলে তা বাদ দেওয়া হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিবাদে বিরোধী দলের সদস্যরা যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তা কতটা সংসদীয় ছিল—সেই প্রশ্নও রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তিনবার তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহার করেন (‘আই উইথড্র’), কিন্তু বিরোধী দলের সদস্যরা শান্ত হননি এবং হইচই অব্যাহত থাকায় তাঁকে বসে যেতে হয়। স্পিকার বারবার তাঁদের বসতে অনুরোধ করেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি বিরোধীদলীয় নেতাকে কথা বলার সুযোগ দেন। তবে স্পিকারের একটি বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। বিরোধী দলের উদ্দেশে স্পিকার বলেন, ‘কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করবেন না। আপনারা যে কয়জন আছেন, তার দ্বিগুণ-তিন গুণ এ পাশে (সরকারি দলে) আছে। সুতরাং শব্দ করে তাঁর বক্তব্য স্তব্ধ করা যাবে না। আমাকে সংসদ পরিচালনা করতে দিন।’ শফিকুর রহমান স্পিকারের সদস্যসংখ্যা উল্লেখ করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেন, স্পিকারের কাছে সরকারি ও বিরোধী দলের প্রত্যেক সদস্যের বক্তব্যের অধিকার সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।

মন্ত্রীকে তাঁর ভাষা ও ভঙ্গিতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ছোট করার উপাদান ছিল কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্পিকারের। প্রশ্নের জবাবে সহিষ্ণুতা, প্রতিবাদে সংযম এবং পরিচালনায় নিরপেক্ষতা—এই তিনটিই সংসদ কার্যকর রাখার জন্য প্রয়োজন।