সংসদে আক্রমণাত্মক ভূমিকা এবং রাজপথে লংমার্চ কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার কৌশল নিয়েছে বিরোধী দল। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য আগামী ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের মধ্য দিয়ে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির নতুন পর্ব শুরু করতে যাচ্ছে। চলমান সংকট পরিস্থিতি এবং জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদে সরব থাকার পাশাপাশি রাজপথেও ধীরে ধীরে বড় আন্দোলনের দিকে যেতে চায় এই জোট। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের শুরুর দিনেই বিরোধী দলের এই কৌশলের আভাস পাওয়া গেছে। সংসদে বিরোধী দলের কৌশল বিরোধীদলীয় সূত্র জানায়, চলমান সংকট নিয়ে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার অনুরোধ করেছিল বিরোধী দল। তা না হওয়ায় তারা চলতি অধিবেশনেই প্রশ্নোত্তর পর্বসহ বিভিন্নভাবে বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার-সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো সামনে আনতে চায়। গত বৃহস্পতিবার চলতি অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের জবাবকে ঘিরে হইচই-হট্টগোলে প্রায় ১০ মিনিট সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সরকার দল-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বিরোধী দলের এমন প্রতিক্রিয়াকে পূর্বপরিকল্পিত মনে করছে। তবে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা ও বিরোধী দলীয় দুজন সংসদ সদস্য দাবি করেন, তাঁরা মন্ত্রীর বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁরা আরও বলেন, ভবিষ্যতে সরকারের কেউ জনবিরোধী বক্তব্য দিলে বিরোধী দল প্রতিবাদ অব্যাহত রাখবে। বিরোধীদলীয় সূত্রগুলো বলছে, তারা সরকারের দুর্বলতা ও জনজীবনের সংকটকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করে ধাপে ধাপে বড় আন্দোলনের দিকে যেতে চায়। এ জন্য গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবির সঙ্গে জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলো যুক্ত করেছে। রাজপথে ১১-দলীয় ঐক্যের কর্মসূচি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য আগামী ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির নতুন পর্ব শুরু করতে চায়। জোটের নেতাদের ধারণা, সরকারের দুর্বলতা স্পষ্ট হলে জন-অসন্তোষ বাড়বে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জনমত গঠন এবং বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। জাতীয় সংসদেও তাঁরা আরও সোচ্চার ভূমিকা রাখতে চান। ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, লংমার্চের রাজনৈতিক বার্তা হলো সংস্কার ও বিচার বাস্তবায়নের দাবিতে সোচ্চার থাকা। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকেও তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন। লংমার্চে ছয়টি প্রধান দাবি তুলে ধরা হবে: গণভোটের রায় বাস্তবায়ন; জুলাই গণহত্যার বিচার; বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার-সংকট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ; অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা। জোটের নেতারা মনে করছেন, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের দাবির সঙ্গে জনজীবনের সংকটগুলো একসঙ্গে সামনে আনতে পারলে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব হবে। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, সরকার গণভোটের রায়ের বিষয়টি ভুলে গেছে। তাঁর দাবি, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কার্যকর পরিবর্তনের আশায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। সেই রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দল আন্দোলন করছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও বলেছেন, গণভোটের রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে ১১-দলীয় ঐক্য ‘তিল পরিমাণ ছাড়’ দেবে না। সংসদে নিষ্পত্তি না হলে তাঁরা রাজপথে থাকবেন। বিরোধী দলের নেতাদের মতে, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে। এই দাবিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে সামনে আনতে চান তাঁরা। লংমার্চের বিস্তারিত ও বৃহত্তর আন্দোলনের পরিকল্পনা ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের মধ্য দিয়ে ১১ দলের ধারাবাহিক কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর, ৩১ অক্টোবর খুলনা এবং ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে লংমার্চ করবে তারা। এসব কর্মসূচির শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশ করবে ১১-দলীয় ঐক্য।