বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জননীতি বিশ্লেষক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সরকার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে কাজ শুরু করলেও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে বাস্তবায়নে হোঁচট খেয়েছে। তাঁর মতে, পরিস্থিতির সামগ্রিক উপলব্ধির ক্ষেত্রে সরকারের ঘাটতি ছিল, যা আকাঙ্ক্ষা পূরণে বাধা সৃষ্টি করেছে। সরকার একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও উত্তরাধিকার নিয়ে এসেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সমস্যা, আঞ্চলিক জটিলতা ও রোহিঙ্গা সমস্যার মতো অভাবনীয় পরিস্থিতির মধ্যে এই ছয় মাস অতিবাহিত করেছে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, সরকার যেসব আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে হোঁচট খেয়েছে। পরিস্থিতির সামগ্রিক উপলব্ধির ঘাটতিকে তিনি এর কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন। মন্ত্রীরা খারাপ পরিস্থিতি পাওয়ার কথা বললেও, এর কোনো দলিল বা শ্বেতপত্র তৈরি করেননি। আমলাতন্ত্র কাজের গতি ধীর করে দেয় এবং বর্তমান সরকারও সেই সমস্যায় পড়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা এবং সরবরাহব্যবস্থায় চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বাজার অর্থনীতির নিরাপত্তাকে ব্যাহত করছে। দল সরকারের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়ছে, যেখানে পদধারী রাজনীতিবিদদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান করা হয়েছে, যা স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করছে।

বাজেটের সময় জনগণকে সত্য কথা বলার কথা বলা হলেও, উত্তরাধিকারসূত্রে খারাপ অবস্থা পাওয়ার কথা ছয় মাস আগে বলা হয়নি। রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয় এবং সরকার নতুন বেতনকাঠামো দিতে পারছে না। জ্বালানিসংকট ছয় মাস আগে বোঝা যায়নি, গ্যাসের অভাবে সার কারখানা বন্ধ। জ্বালানি আমদানির সঙ্গে অর্থায়ন ও ব্যাংক খাতের তারল্য যুক্ত। বেসরকারি খাত দিয়ে আমদানির চেষ্টা পুরোনো অলিগার্কদের ফিরিয়ে আনার বদনাম তৈরি করছে। ব্যাংকে পুরোনো মালিকদের ফেরার আইন করে দুই মাস পর সংশোধন করা এবং মুদ্রানীতি তৈরির দুই সপ্তাহ পর সুদের হার কমানো সমন্বয়ের অভাবের উদাহরণ। সক্ষমতা ও দক্ষতার অভাবও সরকারকে পীড়িত করছে।

অর্থনীতির বর্তমান অবস্থায় সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি ‘কোর বাজেট’ তৈরি করা, যেটি সরকার রক্ষা করবে। দ্বিতীয়ত, অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং বিভিন্ন খাতে রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সরকারের সুশাসনসংক্রান্ত ১৯৯১ সালের আইন অনুযায়ী তিন মাস পরপর প্রতিবেদন দিতে হবে। বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান মূল্যায়নকারী তিনটি বৈদেশিক সংস্থাই দেশের অবনমন করেছে। গত ছয় মাসে সরকারের সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হলো পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রধানমন্ত্রী, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জীবনবৃত্তান্ত সরানো। অর্থনীতিতে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হলো নিজেদের ভুল সংশোধনের শক্তি দেখানো। তবে সবচেয়ে ভুল বা খারাপ সিদ্ধান্ত হলো প্রশাসনিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক পদায়ন, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য জায়গায়।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, একবাক্যে ছয় মাসের মূল্যায়ন হলো—আরও সদিচ্ছা, সক্ষমতা এবং সমন্বয় দরকার হবে। তিনি সরকারকে ‘এ’ দিতে চাইলেও ‘বি’র দিকে টানছে। আগামী ছয় মাসে পাঁচটি পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার: দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা; জ্বালানিসংকটের মধ্যমেয়াদি সমাধান বের করা; ব্যাংক খাতের সমাধানে একটি বোধগম্য পথরেখা দেওয়া; বিনিয়োগ সচল করার উপাদানগুলোর সমাধান; এবং নাগরিক সুবিধা ও সামাজিক সুরক্ষায় কোনোভাবেই দুর্নীতি না হয়, তা নিশ্চিত করা।