আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সম্প্রতি জানিয়েছেন যে, ২০১৫ সালে সালাহউদ্দিন আহমদকে র‍্যাব গুম করেছিল। তিনি উল্লেখ করেন যে, সালাহউদ্দিনকে র‍্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে আটকে রাখা হয়েছিল এবং পরে তাকে ভারতে পাচার করা হয়। এই ঘটনাটি মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার অংশ, যা বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।

চিফ প্রসিকিউটর তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এই তথ্য জানান। তিনি আরও বলেন, এই মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম করার ঘটনায় র‍্যাবের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। একই সাথে, তৎকালীন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কারা কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটনার বিস্তারিত চিত্র উন্মোচনের চেষ্টা চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম ও পাচারের অভিযোগ

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন যে, সালাহউদ্দিন আহমদকে অপহরণ করে দীর্ঘ সময় ধরে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হয়েছিল। তিনি জানান, সালাহউদ্দিনকে তার বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল এবং তাকে র‍্যাবের টিএফআই সেলে আটকে রাখা হয়। এই দুটি স্থান সম্পর্কে তদন্তকারীরা মোটামুটি নিশ্চিত বলে তিনি উল্লেখ করেন। আটক রাখার পর তাকে ভারতে পাচার করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে, যা মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ অভিযোগ করেছিলেন। সে সময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নিয়ে গেছেন। ওই সময়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বিএনপির মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছিলেন, যা তার রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মামলার অগ্রগতি ও জড়িতদের অনুসন্ধান

সালাহউদ্দিন আহমদকে গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলা চলমান রয়েছে। এই মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার সময় জিয়াউল আহসান র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চিফ প্রসিকিউটর জানান, এই মামলার তদন্তে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে এবং র‍্যাবের জড়িত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে তৎকালীন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যা মামলার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করেছে।

এই মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া একটি সংবেদনশীল বিষয় এবং এর মাধ্যমে ঘটনার পেছনের সত্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। চিফ প্রসিকিউটরের মন্তব্য অনুযায়ী, তদন্তকারীরা ঘটনার বিভিন্ন দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করছেন এবং সংশ্লিষ্ট সকল তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছেন।

ভারতে উদ্ধার ও দেশে প্রত্যাবর্তন

একই বছরের ১১ মে ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে স্থানীয় পুলিশ সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্ধার করে। ভারতের পুলিশের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল যে, সালাহউদ্দিন আহমদ শিলংয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করার সময় লোকজনের ফোন পেয়ে তাকে আটক করা হয়। এই ঘটনাটি তার দীর্ঘদিনের নিখোঁজ থাকার পর প্রথম প্রকাশ্যে আসার ঘটনা ছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, ৬ আগস্ট ভারত সরকার সালাহউদ্দিন আহমদকে দেশে ফেরার জন্য ভ্রমণ অনুমোদন বা ট্রাভেল পাস প্রদান করে। এরপর ওই বছরের ১১ আগস্ট তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এই ঘটনাপ্রবাহ সালাহউদ্দিন আহমদের দীর্ঘ অনুপস্থিতি এবং তার দেশে প্রত্যাবর্তনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে, যা দেশের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এই মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, এবং চিফ প্রসিকিউটরের সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘটনার নতুন দিক উন্মোচন করেছে। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য আরও তথ্য ও প্রমাণের অপেক্ষা করা হচ্ছে।