ভারতে সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’ প্রকাশ না করার পেঙ্গুইন র্যানডম হাউস ইন্ডিয়ার সিদ্ধান্তে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন প্রকাশনা সংস্থা আলফ্রেড এ নফ কর্তৃক বইটির প্রকাশের ঘোষণা দেওয়ার দশ দিনের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত আসে, যা নানা প্রশ্ন ও জল্পনা তৈরি করেছে।
গত ১৮ আগস্ট আলফ্রেড এ নফ সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী প্রকাশের কথা ঘোষণা করেছিল। তবে ২৮ আগস্ট পেঙ্গুইন র্যানডম হাউস ইন্ডিয়া জানিয়ে দেয় যে তারা ভারতে বইটি প্রকাশ করবে না। এই অতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে পেঙ্গুইন পাণ্ডুলিপির কিছু অংশকে আপত্তিকর ও ‘অসত্য’ বলে উল্লেখ করেছে। যদিও তাদেরই সহযোগী সংস্থা আলফ্রেড এ নফের কাছে ওই অংশবিশেষ আপত্তিকর মনে হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, সোনিয়া গান্ধী কোন কোন বিষয় কীভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা নিয়ে পেঙ্গুইন র্যানডম হাউসের শেষ মুহূর্তে আপত্তি দেখা দিল। কংগ্রেস নেতারা অভিযোগ করছেন যে শাসক বিজেপির চাপেই ভারতীয় প্রকাশকের এই সিদ্ধান্ত।
আপত্তির মূল বিষয়বস্তু
সংবাদমাধ্যম অনুযায়ী, সোনিয়া তাঁর আত্মজীবনীতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং চীনের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে তথ্য উপস্থাপন করেছেন, পেঙ্গুইন তাতে আপত্তি জানায়। গান্ধী পরিবারের এক সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য হিন্দুস্তান টাইমসে বলা হয়েছে, পেঙ্গুইন ওই অংশ প্রত্যাহারের আরজি জানালেও সোনিয়া রাজি হননি।
ওই সূত্র আরও জানায়, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের এক জনসভায় সোনিয়া গান্ধীকে কীভাবে ‘জার্সি গরু’ বলেছিলেন, তার বিস্তারিত বর্ণনা আত্মজীবনীতে রয়েছে। সোনিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি সম্পর্কে তাঁর ধারণা, তাঁদের মধ্যে দেখা ও কথাবার্তা, সেই সম্পর্কে তাঁর অভিমত ও অনুধাবনের কথা লেখা হয়েছে। প্রকাশকের তাতে সমস্যা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। সোনিয়া দেশের অন্যান্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মোদির তুলনা করেছেন বলেও প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে।
এনডিটিভি কংগ্রেস নেতাদের বরাতে জানিয়েছে যে, পেঙ্গুইন র্যানডম হাউস মূলত তিনটি পরিচ্ছেদ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে: পূর্ব লাদাখের গালওয়ান এলাকায় চীন-ভারত সংঘাত; কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বদানের স্টাইল; এবং ভারতীয় সামাজিক ইতিহাসে আরএসএসের ভূমিকা ও সরকারের ওপর এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব।
প্রকাশকের বিবৃতি ও কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া
শুক্রবার দুপুরে পেঙ্গুইন র্যানডম হাউসের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়, যেখানে তারা আত্মকথনটি প্রকাশ না করার কথা জানায়। তারা স্বীকার করে যে, কিছু তথ্য যাচাইয়ের পর তারা তা পরিমার্জনের প্রস্তাব দিয়েছিল। এই বিবৃতির পরই কংগ্রেস নেতারা সমালোচনায় মুখর হন। তাঁরা বিষয়টিকে ‘বাক্স্বাধীনতা হত্যার’ শামিল বলে বর্ণনা করেন এবং পেঙ্গুইনকে ‘বিক্রি হয়ে গেছে’ বলেও মন্তব্য করেন।
লোকসভায় কংগ্রেসের ডেপুটি লিডার গৌরব গগৈ অভিযোগ করেন, বিজেপির অনেকে ভয় পাচ্ছেন বলেই তাঁরা ভারতে এই বই প্রকাশ ঠেকাতে চাইছেন। রাজস্থানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলত, মধ্যপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী কমলনাথ এবং যুব কংগ্রেসও রাজনৈতিক চাপের সন্দেহ প্রকাশ করে।
আগামী ১৯ নভেম্বর সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল। প্রাথমিকভাবে এক লাখ কপি ছাপার পরিকল্পনা থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতে এই বইয়ের সুলভ সংস্করণ কে প্রকাশ করবে বা কেউ সাহস পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এই বিতর্ক নিয়ে সরকার বা বিজেপি এখনো নীরব। বইটি ভারতে প্রকাশিত হবে না, নাকি নিষিদ্ধ করা হতে পারে, সেই প্রশ্নও উঠছে।