খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের শেষভাগে আরবের গোত্রীয় রাজনীতিতে ‘হারবুল ফিজার’ বা ‘পবিত্রতা লঙ্ঘনের যুদ্ধ’ নামে এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সংঘটিত হয়েছিল। আরবের পুরোনো রীতি ছিল, নিষিদ্ধ চার পবিত্র মাসে কোনো যুদ্ধ হবে না এবং মক্কার হারাম সীমানার ভেতরে রক্তপাত অকল্পনীয়। এই দুটি রীতিই সংঘাতের সময় ভেঙে পড়েছিল, যার কারণে সমকালীন আরবরা এটিকে ‘ফিজার’ বা ‘পাপাচার’ নামে অভিহিত করে। সিরাতের পুরোনো বিবরণে তরুণ মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স নিয়ে যে আপাত-বিরোধ দেখা যায়, তার সমাধান হলো ‘ফিজার’ আসলে একটি নয়, বরং ধারাবাহিক চারটি পৃথক সংঘাতের সমষ্টি ছিল। এই দীর্ঘ সংঘাত একটানা চার-পাঁচ বছর ধরে চলেছিল এবং এর বিভিন্ন পর্বে তরুণ নবীজি (সা.)-এর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফিজার যুদ্ধের প্রকৃতি ও চারটি সংঘাত আরব ইতিহাসবিদ আবুল ফারাজ আল-ইসফাহানি ও ইবনে কাসিরের মতে, প্রাক-ইসলামি আরবে ‘ফিজার’ নামে মোট চারটি পৃথক সংঘাত ঘটেছিল। আধুনিক পাশ্চাত্য গবেষণাতেও এই চার-পর্বের কাঠামো স্বীকৃত। প্রথম সংঘাত ‘ফিজারুল কিরদ’ উকাজের মেলায় বনু কিনানা ও বনু হাওয়াজিনের মধ্যে এক অপমানজনক উপহাস ঘিরে শুরু হয়েছিল। দ্বিতীয় সংঘাত ‘ফিজারুল মারআহ’ বনু আমির গোত্রের এক নারীর সম্মানহানির অভিযোগে কোরাইশ-কিনানা বনাম কায়স আইলানের মধ্যে ঘটেছিল। তৃতীয় সংঘাত ‘ফিজারুদ দাইন’ ছিল এক কোরাইশ বণিকের পাওনা অর্থ নিয়ে বনু নাসরের সঙ্গে ছোট সংঘর্ষ। এই প্রথম তিনটি ছোট সংঘাতের সময় মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স ছিল চৌদ্দ-পনেরোর কাছাকাছি। চতুর্থ ও চূড়ান্ত সংঘাত: লাতিমাহ কাফেলা চতুর্থ ও সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতটি ‘ফিজারুল বাররাদ’ বা ‘হারব শামতাহ’ নামে পরিচিত, যা হিরার রাজা নোমান ইবনে মুনজিরের রাজকীয় কাফেলা লুণ্ঠন এবং উরওয়াহ আর-রাহহালের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল। এই সংঘাত প্রায় চার বছর ধরে চলেছিল। হিরা রাজ্যের শাসক নোমান ইবনে মুনজির প্রতিবছর সুগন্ধি ও রেশমবোঝাই একটি বিশেষ রাজকীয় কাফেলা, যাকে ‘লাতিমাহ’ বলা হতো, উকাজের মেলায় পাঠাতেন। বনু হাওয়াজিনের নেতা উরওয়াহ আর-রাহহাল এই মূল্যবান কাফেলাকে নিরাপদে হেজাজে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পান। কিন্তু বনু কিনানার নির্বাসিত আল-বাররাদ ইবনে কায়স এই দায়িত্ব নিজে না পেয়ে এটিকে বংশীয় অপমান হিসেবে দেখেন। তিনি নিষিদ্ধ জিলকদ মাসে তায়েফের উত্তরের ‘ফিদাক’ উপত্যকায় উরওয়াহকে অতর্কিত হত্যা করে কাফেলাটি লুণ্ঠন করেন। পবিত্র মাসে এই হত্যাকাণ্ড এবং হারাম-সীমানার পবিত্রতা লঙ্ঘনের আশঙ্কা—দুটো মিলিয়েই ঘটনাটি ‘ফিজার’ নাম পায়। হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে কোরাইশ নেতা হারব ইবনে উমাইয়া বুঝতে পারেন যে, উরওয়াহর গোত্র বনু আমির ও কায়স আইলান প্রতিশোধ নিতে তেড়ে আসবে। কোরাইশ ও কিনানা গোত্র সন্ধ্যার আঁধারে উকাজ ছেড়ে মক্কার দিকে দ্রুত পিছু হটে। কায়স গোত্র ধাওয়া করে এবং মক্কার হারাম সীমানার ঠিক প্রবেশমুখে, নাখলা উপত্যকায় কোরাইশদের নাগাল পায়। কিন্তু কোরাইশ-কিনানা জোট ততক্ষণে হারাম সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। পবিত্র সীমানার ভেতরে যুদ্ধ চালানো তৎকালীন আরব সমাজে গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য হওয়ায় কায়স বাহিনী সীমানার মুখেই থমকে যায় এবং পরের বছর উকাজেই চূড়ান্ত ফয়সালার ঘোষণা দিয়ে ফিরে যায়। রণক্ষেত্রে তরুণ মুহাম্মদ (সা.)-এর ভূমিকা ও যুদ্ধের অবসান চূড়ান্ত রক্তক্ষয়ী পর্বে মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স বিশ বছর হয়েছিল। তিনি সরাসরি তরবারি বা তির চালাননি; তাঁর ভূমিকা ছিল সুনির্দিষ্ট রসদ-সহায়তামূলক, শত্রুপক্ষের ছোড়া তির কুড়িয়ে চাচাদের হাতে তুলে দিতেন। এটি ছিল সম্মুখসারির কাছাকাছি থেকে করা এক ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলগত দায়িত্ব। উভয় পক্ষের বহু যোদ্ধা নিহত হওয়ার পর যুদ্ধ এক অচলাবস্থায় পৌঁছায়। হেজাজের বাণিজ্য-অর্থনীতি বিপর্যস্ত হওয়ায় উভয় পক্ষই আপসে আগ্রহী হয়। কায়স আইলান গোত্রের নিহতের সংখ্যা কোরাইশ-কিনানার চেয়ে বিশ জন বেশি ছিল। হারব ইবনে উমাইয়া অতিরিক্ত কুড়িজনের রক্তপণ নিজে বহন করার প্রতিশ্রুতি দিলে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।