খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ ও শেষ বিদায়ের আয়োজন
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজার ঠিক পূর্বে তার সুদীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবন, সংগ্রামী রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং দেশের কল্যাণে অবদান সবার সামনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন দলের স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য নজরুল ইসলাম খান। বুধবার বিকেলে জানাজার জন্য বিশেষভাবে নির্মিত মঞ্চ থেকে দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যে তিনি বেগম জিয়ার জীবনের নানা উল্লেখযোগ্য অধ্যায় স্মৃতিচারণ করেন। এই বক্তব্যে বেগম জিয়ার জন্ম, পারিবারিক পটভূমি, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক, রাজনীতিতে তার নাটকীয় আত্মপ্রকাশ এবং পরবর্তী সময়ে দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য তার অসীম ত্যাগের গল্প অত্যন্ত নিখুঁতভাবে উপস্থাপিত হয়।
মরদেহের যাত্রা এবং শেষ শ্রদ্ধার আনুষ্ঠানিকতা
এর আগে বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে সর্বসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা ও জানাজার উদ্দেশ্যে বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহ রাজধানী ঢাকা-র ঐতিহাসিক মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ-তে নিয়ে আসা হয়। জাতীয় সংসদের সামনে সুবিশাল এই চত্বরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত লক্ষ লক্ষ মানুষের অংশগ্রহণে তার বিশাল জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার সার্বিক প্রক্রিয়া সমাপ্ত হওয়ার পর তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার প্রিয় স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করার সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
এদিন সকালে বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহ দীর্ঘদিনের চিকিৎসাস্থল এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে সরাসরি গুলশান এলাকার বাসভবনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী মরদেহটি গুলশানে তার বহু বছরের ঐতিহাসিক বাসভবন ফিরোজা-য় নেওয়ার কথা চূড়ান্ত হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে পারিবারিক ও নিরাপত্তাজনিত নানা সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় মরদেহবাহী গাড়িবহরটি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্বজন, অনুরাগী ও দলীয় নেতাকর্মীরা তাকে শেষবারের মতো এক নজর দেখেন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন।
দীর্ঘ চিকিৎসাসেবা ও অদম্য সংগ্রামের সমাপ্তি
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত চিকিৎসাকেন্দ্র এভারকেয়ার হাসপাতাল-এ টানা ৩৭ দিন ধরে সিসিইউ ও বিশেষ কেবিনে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে চিকিৎসাধীন থাকার পর মঙ্গলবার ভোরে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। উল্লেখ্য, গত ২৩ নভেম্বর গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা ও জটিলতা নিয়ে তাকে এই হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে ভর্তি করা হয়েছিল। এর পর থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল দিনরাত ২৪ ঘণ্টা তাকে সার্বিক পর্যবেক্ষণে রাখে এবং সর্বোচ্চ আধুনিক চিকিৎসা প্রদান করে।
বেগম খালেদা জিয়ার অন্তিম বিদায়ে পুরো দেশজুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তার এই অপূরণীয় ক্ষতিতে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছে। তার মৃত্যুর খবরে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ ও শুভানুধ্যায়ীরা চরম দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং রাজপথে নেমে এসেছিলেন। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও তৎসংলগ্ন এলাকাগুলোতে স্মরণকালের অন্যতম বৃহত্তম মানবঢল প্রত্যক্ষ করা গেছে। হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ব্যানার, ফেস্টুন এবং কালো ব্যাজ ধারণ করে প্রয়াত এই নেত্রীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন এবং পরম করুণাময় মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে তার আত্মার মাগফিরাত প্রার্থনা করেন।
দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি যে আপসহীন নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বাংলাদেশ-এর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের এক বিশ্বস্ত প্রতীক ও প্রচ্ছায়াতুল্য অনুপ্রেরণার নাম। তার রেখে যাওয়া আদর্শ, কর্মপ্রচেষ্টা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য এক চিরন্তন দিশারী হিসেবে কাজ করবে। বহু ঘাত-প্রতিঘাত, কারাভোগ ও নির্মম শারীরিক অসুস্থতার মুখোমুখি হয়েও তিনি কখনোই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি কিংবা কোনো অন্যায় চাপের কাছে আপস করেননি, যা তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে দিয়েছে।
#রাজনীতি #বাংলাদেশ #সংবাদ #খালেদা_জিয়া