সংস্কৃতির চর্চা ছাড়া গণতন্ত্র ও ইতিহাস টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়: রুহুল কবির রিজভী
বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য এবং আধ্যাত্মিক সাধনার ধারাবাহিক চর্চা বজায় না থাকলে জাতি তার নিজস্ব ইতিহাস ও শেকড় হারিয়ে ফেলবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি-র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দেশে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা এবং তা দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে নিজস্ব সংস্কৃতির অবাধ চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ঢাকা-র শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত এক বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন।
গণতান্ত্রিক লড়াই, মানবিক মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ
রিজভী বলেন, “আমরা যে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য দীর্ঘ ১৬-১৭ বছর ধরে ধারাবাহিক সংগ্রাম করেছি, সেই আকাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে হলে শুদ্ধ ঈশ্বরপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ, আধ্যাত্মিক ভাবনা ও লোকজ সাহিত্যের অনুশীলন অব্যাহত রাখতে হবে।” তিনি আরও সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি আমরা এই চর্চা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ি, তবে খুব দ্রুতই নিজেদের ইতিহাস, প্রাচীন সংস্কৃতি ও গৌরবময় ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব।
পহেলা বৈশাখকে বাংলাদেশ-এর অন্যতম প্রধান নিজস্ব সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, একসময় এই উৎসব মূলত গ্রামীণ সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু বর্তমানে এটি শহর থেকে গ্রামে সর্বত্র ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। অতীতে ব্যবসায়ীরা হালখাতার মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নিতেন এবং সাধারণ মানুষ বাংলা পঞ্জিকা অনুসরণ করে জীবনযাপন করতেন। তবে আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি জানান, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম বাংলা সাল ও বর্ষপঞ্জির ব্যবহার থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে, যা আমাদের জাতীয় পরিচয়ের জন্য এক মারাত্মক সংকট তৈরি করছে।
বিশ্বায়ন, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও লোকজ ধারার ওপর আক্রমণ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে তিনি উল্লেখ করেন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো বিশ্বায়নের প্রভাবে নিজেদের মৌলিক বর্ণমালা হারিয়ে রোমান লিপি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে, যা সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্বের বড় লক্ষণ। তবে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশ নিজের বর্ণমালা ও লিপি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। দেশের স্বকীয় সংস্কৃতিকে ধর্মবিরোধী হিসেবে দেখার প্রবণতাকে ভুল আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ইসলামী মূল্যবোধ ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অপূর্ব সমন্বয়ে এই অঞ্চলের কৃষ্টি গড়ে উঠেছে। ইউসুফ-জুলেখা, লাইলি-মজনু, রামায়ণভিত্তিক আখ্যান, গম্ভীরা, কবিগান, জারি-সারি ও যাত্রাপালার মতো শিল্পমাধ্যমগুলো আমাদের অভিন্ন সংস্কৃতির মজবুত ভিত্তি।
উগ্রবাদ প্রতিরোধ ও জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ
বাউল ও সুফি ঐতিহ্যকে জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করে সাবেক এই ছাত্রনেতা বলেন, “যদি উগ্রবাদী মানসিকতা দিয়ে আমাদের লোকজ সংস্কৃতিকে আক্রমণ করা হয়, তবে তা মূল সাংস্কৃতিক মূলবোধকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে।” মাজারের পীর ও বাউল সাধকদের ওপর সাম্প্রতিক বিভিন্ন আঘাতকে তিনি দেশের সংস্কৃতির মর্মমূলে সরাসরি আঘাত বলে অভিহিত করেন। তিনি সংস্কৃতির পরিচ্ছন্ন চর্চা ধরে রাখার পাশাপাশি এতে যেন কোনো ধরনের অশ্লীলতা প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে সকলকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। সবশেষে তিনি বলেন, যাত্রাপালা ও লোকজ পরিবেশন শিল্পগুলো একসময় সাধারণ মানুষের মনে গভীর দেশপ্রেম ও স্বাধিকার আন্দোলন গড়ে তুলতে অপরিসীম অবদান রেখেছিল।
#সংস্কৃতি #বাংলাদেশ #রাজনীতি #ঐতিহ্য