সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি তাঁর ৬১ দিনের রহস্যজনক অন্তর্ধান এবং ভারতে উদ্ধার হওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরা থেকে তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন। সে সময় তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবের পদে ছিলেন এবং বিএনপি অভিযোগ করেছিল যে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তাঁকে তুলে নিয়ে গেছে। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি নিজের ব্যক্তিগত যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেন। বন্দিদশা ও ভারতে যাত্রা সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, তাঁকে একটি ছোট কক্ষে ৬১ দিন আটকে রাখা হয়েছিল, যা প্রায় ৮ ফুট বাই ৪ ফুট আকারের ছিল। কক্ষটিতে একটি পানির কল এবং শৌচকার্যের জন্য একটি চিকন ছিদ্র ছিল। মেঝেতে একটি কম্বল বিছানো ছিল। তাঁকে প্রতিদিন এক বেলা নাশতা ও দুই বেলা খাবার দেওয়া হতো। অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাঁকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। দরজার বাইরে সব সময় একটি বৈদ্যুতিক পাখা চলত। একদিন খাবার দিতে এসে তাঁর কোনো সাড়া না পেয়ে আটককারীরা দরজা খোলে এবং তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পায়। এরপর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চোখ বেঁধে তাঁকে গাড়িতে তোলা হয়। কয়েক ঘণ্টা চলার পর রাত গভীর হলে জিপের মতো একটি গাড়িতে করে আরও একটি জায়গায় নিয়ে গিয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় রাখা হয়। সেখানে তিনি কিছু মানুষের কথাবার্তা শুনতে পান এবং দীর্ঘ সময় তাঁদের সঙ্গে কথা হয়। একপর্যায়ে এক কর্মকর্তা তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত কামরুজ্জামান সাহেবের ফাঁসির খবর জানান, যা শুনে তিনি অবাক হন কারণ ৬১ দিন ধরে আটক থাকায় বাইরের কোনো খবর তাঁর জানা ছিল না। শিলংয়ে উদ্ধার, আইনি প্রক্রিয়া ও দেশে প্রত্যাবর্তন আরও কয়েক ঘণ্টা রাখার পর তাঁর চোখ খুলে দেওয়া হয়, তবে যারা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল, তারা নিজেদের চোখ ঢেকে রাখে যাতে তিনি তাদের চিনতে না পারেন। সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, এরপর তাঁকে একটি নির্জন এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয় যখন সূর্য ওঠার সময়। পাশের একটি বিলবোর্ড দেখে তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে আছেন। স্থানীয় লোকজনের অনুরোধে পুলিশ এসে তাঁকে থানায় নিয়ে যায় এবং জিজ্ঞাসাবাদ করে। এরপর তাঁকে একটি বেসামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে তিনি চিকিৎসককে নিজের পরিচয় ও টেলিফোন নম্বর দিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অনুরোধ করেন। তবে পুলিশ তাঁকে মানসিক ভারসাম্যহীন ভেবে একটি মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা হয় এবং তিনি আবারও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেন। তাঁর ছবিও তোলা হয়, যা পরে প্রকাশিত হয়েছিল। হাসপাতালে তাঁকে মানসিক রোগীদের সঙ্গে রাখা হয় এবং মানসিক রোগের ওষুধ খাওয়ানো হয়। এই সময়ে তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি হয়তো বিদেশের মাটিতে পাগল অবস্থায় মারা যাবেন এবং তাঁর পরিবার হয়তো তাঁর কবরও দেখতে পারবে না। একদিন হাসপাতাল থেকে জানানো হয় যে তাঁর জন্য একটি টেলিফোন এসেছে। ফোনটি করেছিলেন তাঁর স্ত্রী। ফোনে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বুঝতে পারেন যে পরিবার তাঁর অবস্থান জানতে পেরেছে। এই স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এবং জানান যে তাঁর স্ত্রীও হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিলেন। এরপর তাঁকে হাসপাতাল থেকে বের করে আনার ব্যবস্থা শুরু হয়। পুলিশ ও চিকিৎসকেরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করেন। এরপর তাঁকে সিভিল হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে তিনি দূর থেকে একটি টেলিভিশন ক্যামেরা দেখতে পান। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেছিলেন, "ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন"।