২০১৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরে তৎকালীন ছাত্রদল নেতা টিপু হাওলাদারকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং এর একদিন পরই তাকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হয় বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ সাক্ষ্য দিয়েছেন মোছা. সেলিনা বেগম। বরিশালে ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে ‘ক্রসফায়ার’ দেওয়ার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মঙ্গলবার তিনি এই জবানবন্দি দেন। এই জবানবন্দিতে সেলিনা বেগম ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন, যা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
সাক্ষী সেলিনা বেগম তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন যে, টিপু হাওলাদার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরে সেলিনা বেগমের বাড়িতে আসেন। টিপু হাওলাদার ছিলেন সেলিনা বেগমের ভাগনির স্বামী, যিনি ২০১১ সালে তার ভাগনিকে বিয়ে করেন এবং তাদের দুটি সন্তান রয়েছে। টিপু হাওলাদারের কেরানীগঞ্জের বাড়িতে আসার দুই দিন পর, অর্থাৎ ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে তার বাসায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে কিছু লোক আসে।
টিপু হাওলাদারকে তুলে নিয়ে যাওয়া
সেলিনা বেগম জানান, ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে তার বাসায় আসা লোকজন নিজেদের ডিবি পুলিশ হিসেবে পরিচয় দেয়। তারা যখন তাদের পরিচয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন তারা জানায় যে তারা বরিশাল থেকে এসেছেন এবং তাদের সঙ্গে ঢাকার কিছু লোকও আছেন। এরপর তারা টিপু হাওলাদারকে ঘুম থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এই আকস্মিক ঘটনায় সেলিনা বেগম চিৎকার শুরু করেন। তার চিৎকারে পাশের বাসা থেকে নাহার বেগম নামে একজন প্রতিবেশী এগিয়ে আসেন। সেলিনা বেগম এবং নাহার বেগম দুজনই টিপুকে যে গাড়িতে তোলা হয়, সে পর্যন্ত যান।
সেলিনা বেগম আরও বলেন, টিপুকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সে রাতেই তিনি তার ভাগনিকে ফোন করে এই ঘটনার বিস্তারিত জানান। এরপর, ঘটনার দুই দিন পর, অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে তিনি টেলিভিশনে সংবাদ দেখেন। টেলিভিশনের খবরে জানানো হয় যে টিপু এবং কবির নামে দুজন ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়েছেন। পরবর্তীতে, তার ভাগনির কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন যে, অন্য থানার দুজন পুলিশ টিপুকে ‘ক্রসফায়ার’ দিয়ে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা ও অভিযুক্তরা
২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং একই উপজেলার জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লাকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই গুরুতর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা দায়ের করা হয়, যার বিচারিক কার্যক্রম বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ চলমান।
এই মামলায় মোট চারজন ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, যার রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এবং বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসানউল্লাহ। এই দুজন আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। মামলার অপর দুই আসামি হলেন বরিশালের উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম এবং মো. জসিম উদ্দিন। তারা দুজনই গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং বর্তমানে কারাগারে আছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করা হচ্ছে, যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।