জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও একটি ফলপ্রসূ ঐকমত্যে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। রোববার (২২ জুন) রাজধানীর বেইলি রোডে অবস্থিত ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে চলমান সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। নুরুল হক নুর তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও, আলোচনার টেবিলে অনেকেই ১০ বছরের মেয়াদের কথা উত্থাপন করেছেন। এই বিষয়ে গণঅধিকার পরিষদ বৃহত্তর ঐকমত্যের পক্ষে অবস্থান নিলেও, দুই মেয়াদ হোক কিংবা ১০ বছর—এই নির্দিষ্ট জায়গায় একমত হওয়া সম্ভব হলেও এখনো পর্যন্ত একটি চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি, যা তিনি অত্যন্ত দুঃখজনক বলে অভিহিত করেছেন। এই ধরনের মতপার্থক্য জাতীয় ঐক্যের পথে একটি বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে তার অভিমত। রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার ও ক্ষমতার ভারসাম্য তিনি জানান, বর্তমান আলোচনাগুলো একটি গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রেক্ষাপটে শুরু হয়েছে। এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চলছে। এই সংস্কারগুলো দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য বলে তিনি মনে করেন। সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত আলোচনায় গণঅধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির মতো মৌলিক বিষয়গুলো সংবিধানে যুক্ত করা। নুরুল হক নুর আরও বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলেও, গণঅধিকার পরিষদ দৃঢ়ভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতির পক্ষে তাদের অবস্থান জানিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, অন্যান্য দলের দেওয়া মতামতের ভিত্তিতে একটি কমিশন ইতোমধ্যে একটি খসড়া আলোচনা করেছে, যেখানে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার এবং গণতন্ত্রের মূলনীতিগুলোর কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়গুলো দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংলাপে নেতাদের ভূমিকা ও অমীমাংসিত বিষয় বৈঠকে কিছু রাজনৈতিক নেতার ভূমিকা নিয়ে নুরুল হক নুর তার গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, অনেক নেতা সংবাদমাধ্যমের সামনে ইতিবাচক এবং গঠনমূলক কথা বললেও, ভেতরের আলোচনায় এসে নিজেদের পূর্বের অবস্থানে অনড় থাকেন এবং ঐকমত্যে পৌঁছাতে চান না। তার মতে, কমিশনের মিটিংগুলো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করলেই বোঝা যায় যে, এই ধরনের অনমনীয়তার কারণে বারবার আলোচনায় গতি থেমে যাচ্ছে এবং কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, দুই দিন বিরতির পর আগামী বুধবার আবার এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হবে। এখনো যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অমীমাংসিত অবস্থায় ঝুলে আছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—এনসিসি (জাতীয় নির্বাচন কমিশন), দিকনির্দেশনামূলক সংসদ, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ এবং সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো। এই বিষয়গুলো নিয়ে এখনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি, যা সংলাপের অগ্রগতিকে ধীর করে দিচ্ছে। “আবার যদি প্রতিবার বৈঠকে এসে দলের ফোন বা নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে তো এই মিটিংয়ের আসল উদ্দেশ্যটাই ব্যাহত হচ্ছে।” নুরুল হক নুর এই মন্তব্যের মাধ্যমে আলোচনার কার্যকারিতা এবং দলগুলোর আন্তরিকতা নিয়ে তার উদ্বেগ পুনর্ব্যক্ত করেন।