আইন ও বিচারব্যবস্থা সংস্কারে জামায়াতে ইসলামীর ১৬ দফা পরিকল্পনা

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত নির্বাচনি ইশতেহারে আইন ও বিচারব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সম্প্রতি বনানীর এক অভিজাত হোটেলে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার উন্মোচন করেন। এতে বলা হয়েছে, দলটির রাষ্ট্র পরিচালনার মূল স্তম্ভ হবে আইন সংস্কার, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং দ্রুত বিচারিক সেবা প্রদান। চাঁদাবাজি, ঘুষ ও যেকোনো ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ জোরদার করতে ‘ডিজিটাল পাহারাদার’ নামক একটি মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েবসাইট চালুর ঘোষণা দিয়েছে দলটি।

বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও স্বাধীন বিচার বিভাগ

ইশতেহারে আইন ও বিচার বিভাগের আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে মোট ১৬টি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও গতিশীল করতে প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে ও বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নতুন বিচারক নিয়োগ এবং আদালতগুলোর ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা উল্লেখ করা হয়। এছাড়া বিদ্যমান তদন্ত ও বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রসিকিউশন সার্ভিস গঠনের সুদৃঢ় অঙ্গীকার প্রকাশ করেছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার লক্ষ্যে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ইশতেহারে স্পষ্ট করা হয়েছে। বিশেষ করে বেআইনি গণগ্রেফতার, রিমান্ডে নির্যাতন, গুম এবং তথাকথিত গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’-এর মতো বিতর্কিত ব্যবস্থার বিলোপ ঘটাতে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার সাধন করা হবে। একইসঙ্গে মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য শরিয়াহসম্মত পার্সোনাল ল’ প্রণয়ন এবং সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আলাদা বিশেষ বেঞ্চ গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এতে নারীদের জন্য উত্তরাধিকার সম্পত্তির ন্যায্য অংশপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণের বিষয়টিও অগ্রাধিকার পেয়েছে।

বিশেষায়িত আদালত, প্রাচীন আইন সংস্কার ও সামাজিক ন্যায়বিচার

জনগণের কাছে দ্রুত বিচার পৌঁছাতে দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন এবং বিশেষায়িত আদালত গঠনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের বিচার ব্যবস্থা ও সরকারি আইনি সহায়তা পুনর্গঠন করা হবে। দণ্ডবিধি ১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এবং দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮-এর মতো শতাব্দীর প্রাচীন আইনগুলোকে আধুনিক যুগের উপযোগী করে সংস্কার করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

ইসলামি অর্থনীতিকে গতিশীল ও বেগবান করতে ওয়াকফ এবং যাকাত সংক্রান্ত আইনি কাঠামোর পরিবর্তন আনা হবে। ব্যাংক, তাকাফুল বা ইসলামি বিমা খাতের জন্য নতুন যুগের উপযোগী নতুন আইন তৈরি করা হবে। এছাড়া প্রান্তিক ও আর্থিক সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কথা চিন্তা করে প্রতিটি থানা পর্যায়ে সরকারি লিগ্যাল এইড সেল গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। অতীতে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বস্তুনিষ্ঠ তথ্য উদঘাটনে জাতিসংঘের কারিগরি সহযোগিতায় একটি ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন ও বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।

অপরাধ দমনে যুগান্তকারী ‘ডিজিটাল পাহারাদার’ প্ল্যাটফর্ম

সমাজ থেকে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নির্মূলে ‘ডিজিটাল পাহারাদার’ নামক আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হবে। নাগরিকরা সরাসরি অডিও, ভিডিও কিংবা ছবি যুক্ত করে অত্যন্ত সহজে অপরাধের অভিযোগ জানাতে পারবেন। এসব অভিযোগ সরাসরি প্রশাসনের কাছে পৌঁছাবে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক রাখা হবে। আবেদনকারী অ্যাপের মাধ্যমেই অভিযোগের অগ্রগতি সরাসরি ট্র্যাক করতে পারবেন এবং নিরাপত্তার সুবিধার্থে নাগরিকের পরিচয় গোপন থাকবে। সাধারণ মোবাইল গ্রাহকদের জন্য একটি নির্ধারিত হটলাইন নম্বরও উন্মুক্ত রাখা হবে।

#রাজনীতি #বাংলাদেশ #নির্বাচন #ইশতেহার