বিএনপি তার ৪৮ বছর পূর্ণ করেছে। রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে দলটি প্রায় অর্ধশতাব্দী অতিক্রম করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিএনপি অন্তত তিনবার গভীর সংকটের সম্মুখীন হয়েছে এবং একাধিকবার দলে ভাঙন দেখা দিয়েছে। অনেকে দলটির টিকে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, বিএনপি সেসব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে চতুর্থবারের মতো বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচররা দল ছেড়ে গেলেও নতুন অনেকেই যুক্ত হয়েছেন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং তার নেতৃত্বে দলটি দুবার ক্ষমতায় আসে। বর্তমানে তারেক রহমানের হাত ধরে বিএনপির তৃতীয় প্রজন্মের নেতৃত্ব ক্ষমতায় রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ বিএনপি বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছে এবং এরই মধ্যে ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। এই সময়ে দলটিকে পুরোপুরি সফল বলা যায় না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং কিছু মন্ত্রীর অতিকথন সাধারণ মানুষের অসন্তোষের কারণ হতে পারে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিকে এই বিষয়গুলো সতর্কভাবে বিবেচনা করতে হবে। বিএনপির টিকে থাকার কারণ নানা বৈরিতা, ষড়যন্ত্র ও কঠিন সময় মোকাবিলা করেও বিএনপি রাজনীতিতে শক্তভাবে টিকে থাকার মূল কারণ হিসেবে এর জনগণকেন্দ্রিক রাজনীতিকে উল্লেখ করা হয়েছে। দলটি শুরু থেকেই চরমপন্থী রাজনীতি পরিহার করে উদার গণতান্ত্রিক মধ্যবাম বা সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ধারার রাজনীতি অনুসরণ করেছে। দলটির গঠনতন্ত্র, জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০ এবং তারেক রহমানের ৩১ দফায় এই মধ্যবাম রাজনীতির প্রতিফলন দেখা যায়। জিয়াউর রহমানের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত বিএনপির শুরুর দিকের কর্মসূচিতে উদার রাজনীতির মাধ্যমে জনগণকে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা ছিল। গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে নগরকেন্দ্রিক নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটেছিল জিয়াউর রহমানের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ধারার উদার, কিন্তু রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পুঁজির বিকাশের ফলেই। এই নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাত ধরে সাংস্কৃতিক ধারার পরিবর্তন শুরু হয়। জিয়াউর রহমানই প্রথম দেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সরকারি অনুদান দেওয়া শুরু করেন এবং নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। আওয়ামী লীগের জাতীয়তাবাদী চরমপন্থী রাজনীতি বা মুসলিম লীগ-পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামীর ধর্মবাদী কট্টরপন্থার বিপরীতে এই উদার রাজনীতি প্রয়োজনীয় ছিল। দেশের সবাইকে একটি সাধারণ পরিচয়ের গণ্ডিতে আনার উদ্দেশ্যেই জিয়াউর রহমান 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে'র উদার ধারণা রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। তবে, নিবন্ধে বলা হয়েছে যে প্রচণ্ড কট্টর বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করেও আওয়ামী লীগ নিজেদের উদার ও মুক্তমনা রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা টিকতে পারেনি এবং 'ফ্যাসিবাদ' কায়েম করে দেশ থেকে পালাতে হয়েছে। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে 'ফ্যাসিবাদ'কে উল্লেখ করা হয়েছে, যা আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর ভর করেই আওয়ামী লীগের পতন হয়েছে। বিপরীতে, নানা সংকটের পর এবং উদার রাজনীতির কারণে বিএনপি বারবার টিকে গেছে। যদিও বিএনপির পক্ষে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক বয়ান নেই, তবে বহুপক্ষীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি কোনো ধরনের শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। কোনো জাতি, গোষ্ঠী, ভাষা বা ধর্মের একক আধিপত্য এ ধরনের জাতীয়তাবাদে থাকে না, ফলে এর একক কোনো সাংস্কৃতিক পরিচয় বা বয়ানও থাকে না। গত শতকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে উদার গণতান্ত্রিক ধারার যে রাজনীতির সূচনা হয়েছিল, বিএনপির রাজনীতিতে তার ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। গঠনতান্ত্রিক দিক থেকে বিএনপি এই উদার রাজনীতির ধারণা ভালোভাবে রপ্ত করেছিল। ভবিষ্যৎ পথ ও জনগণের আস্থা তবে, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের পর ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে ক্ষমতাকেন্দ্রিক ঘনিষ্ঠতা বিএনপিকে সেই উদার অবস্থান থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে দিয়েছিল।