ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ: নুরুল হক নুর

চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক স্মারক সভায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য চিন্তাবিদ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অসামান্য স্মৃতিচারণ করে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেছেন, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কেবল কোনো ব্যক্তি ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সমগ্র বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য ও অত্যন্ত উজ্জ্বল অংশ। তার প্রতি শুধু ব্যক্তিগতভাবে কারও নয়, বরং সমগ্র জাতিরই অসীম ও গভীর ঋণ রয়েছে। আজকের এই জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার মতো দূরদর্শী মানুষের অভাব প্রতিটি পদে পদে তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।

ইতিহাস চর্চা, মিতব্যয়িতা ও সাধারণ জীবনের শিক্ষা

চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় বক্তারা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর দীর্ঘ ও সাহসী জীবনের বহু অজানা ও অনুপ্রেরণাদায়ক দিক তুলে ধরেন। নুরুল হক নুর তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, “ইতিহাস চর্চা ও অতীতের মহান ব্যক্তিদের আদর্শ অনুসরনের মধ্য দিয়েই আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণের প্রকৃত অনুপ্রেরণা খুঁজে পাওয়া সম্ভব।” তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সারা জীবন অত্যন্ত আড়ম্বরবিমুখ, সাধারণ এবং বিনয়ী জীবনযাপন করে গেছেন। তিনি বিশাল বাজেটের আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের পরিবর্তে সর্বদাই মিতব্যয়িতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। সাধারণ মানুষের দেওয়া চাল, ডাল কিংবা শাকসবজি দিয়েই তিনি অত্যন্ত সানন্দে বিশিষ্ট অতিথিদের আপ্যায়নের আয়োজন করতেন, যা তার অনাবিল সরলতার পরিচয় দেয়।

স্পষ্টভাষী নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক কাঠামোর নতুন চিন্তা

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সাথে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ এবং নোবেলজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও গভীর সম্পর্কের কথা স্মরণ করে অনুষ্ঠানে বিশদ আলোচনা করা হয়। তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত সাহসী ও স্পষ্টভাষী মানুষ। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে কিংবা সত্য কথা বলতে তিনি কখনো বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করতেন না। প্রতিমন্ত্রী বলেন, আজ যদি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জীবিত থাকতেন, তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন নীতিগত সীমাবদ্ধতা ও ভুলত্রুটি নিয়ে সরাসরি প্রফেসর ইউনূসকে প্রশ্ন করতেন এবং প্রয়োজনীয় গঠনমূলক পরামর্শ দিতেন।

দেশের সার্বিক শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নিজস্ব ও সুচিন্তিত ভাবনার কথা উল্লেখ করে নুর জানান, তিনি প্রায়শই দেশে প্রাদেশিক সরকার পদ্ধতি চালু করার কথা বলতেন। তার মতে, প্রাদেশিক ব্যবস্থা চালু হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসকদের মধ্যে কাজের সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হতো এবং স্থানীয় জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঠিক মূল্যায়ন করা অনেক সহজ ও কার্যকর হতো।

রাজনৈতিক সংকট ও মানবসেবায় অসামান্য অবদান

দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকটকাল ও কঠিন বাস্তবতায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ঐতিহাসিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করা হয়। প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, গত ১৬ বছরের স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যখন বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি ক্রমাগত মামলা, গ্রেফতার ও তীব্র দমন-পীড়নের মুখে নিজেদের আন্দোলন সংগঠিত করতে চরম হিমশিম খাচ্ছিল, তখন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী স্বোচ্ছায় এগিয়ে এসেছিলেন। তিনি গণসংগ্রাম ও গণআন্দোলনকে সফল করার লক্ষ্যে একটি বিকল্প ও সমান্তরাল শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের সময়োপযোগী প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

স্মরণসভায় উপস্থিত অপরাপর বক্তারা একবাক্যে স্বীকার করেন যে, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কখনো নির্দিষ্ট কোনো সংকীর্ণ রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারির ভয়াবহ সংকটের সময় তার প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মাধ্যমে পরিচালিত ত্রাণ ও চিকিৎসা সাহায্য কার্যক্রম ছিল দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের জন্য উন্মুক্ত। এছাড়া যেকোনো জাতীয় সংকটকালে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে তিনি সর্বদা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

#রাজনীতি #বাংলাদেশ #গণস্বাস্থ্য #স্মরণসভা