ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই বেতন বৃদ্ধি সরকারের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে, যা বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া পরিশোধ, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকি প্রদান এবং জ্বালানি ক্রয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থায়নে বাধা দিচ্ছে। একই সাথে, সমাজে বিদ্যমান আয়বৈষম্য এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের মধ্যে ‘ওঁরা বনাম আমরা’ মনোভাব সরকারের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুটি বেতন ও মজুরি সুপারিশ এসেছিল; একটি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন উচ্চহারে বাড়ানো এবং অন্যটি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি হার ঘোষণা। বেতন কমিশন নিয়ে উৎসাহ দেখালেও শ্রম কমিশনের সুপারিশ তেমন আলোচনায় আসেনি, যদিও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শ্রমজীবী মানুষের আত্মত্যাগ ছিল সবচেয়ে বেশি। নতুন সরকার গঠনের পর পোশাকশ্রমিকেরা আন্দোলন ও গুলিতে প্রাণ দিয়েও মজুরি মাত্র ৪ শতাংশ বেশি বাড়াতে সক্ষম হন, যা তৎকালীন মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম হওয়ায় প্রকৃত আয় কমে যায়। আর্থিক সংকট ও বেতন বৃদ্ধির চাপ উচ্চহারে বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় চাপ রেখে গিয়েছিল। বর্তমান সরকারের কাছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপুল বকেয়া পরিশোধের টাকা নেই, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকি দেওয়ার অর্থ নেই, টাকার অভাবে জ্বালানি কেনা যাচ্ছে না, বাজেটে বিরাট ঘাটতি এবং রাজস্ব আদায়ও কম। এমন পরিস্থিতিতে বেতন বাড়াতে আরও বেশি টাকার প্রয়োজন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনপ্রশাসনে বাড়তি ৫৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। উচ্চহারে বেতন বাড়াতে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে। বিএনপি সরকার জানে যে বেতন না বাড়ালে প্রশাসনযন্ত্র অসন্তুষ্ট হয়ে কাজ বন্ধ করে দিতে পারে। আয়বৈষম্য ও ‘আমরা বনাম ওঁরা’ দেশে দীর্ঘদিন ধরেই আয়বৈষম্য বিপজ্জনক পর্যায়ে। সমাজের একটি অংশ যখন আড়াই হাজার টাকা কেজি দরে ইলিশ কিনে বাসায় ফেরে, তখন আরেকটি বড় অংশ কিছুটা কম দামে চাল কিনতে লাইনে দাঁড়িয়ে রোদে পোড়ে। করোনাকালে ‘লকডাউনের’ মধ্যে যখন বহু মানুষ চাকরি হারাচ্ছিলেন, বেতন কাটছাঁট হচ্ছিল, তখন সরকারি চাকরিজীবীদের কোনো চিন্তা ছিল না। তাঁরা পূর্ণ বেতন ও পূর্ণ উৎসব ভাতা নিয়ে ছুটিতে ছিলেন। এ ধরনের বৈপরীত্য সমাজের মধ্যে ‘আমরা বনাম ওঁরা’—এই অনুভূতি তৈরি করে, যা ভয়ংকর। বৈষম্যের শিকার হওয়ার বোধই ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামিয়েছিল। মাসে সাত থেকে আট হাজার টাকা বেতনে দোকান ও কারখানায় চাকরি করা এবং ফুটপাতে হকারি করে আয় করা তরুণ ও যুবারাই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সামনের সারিতে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে থাকা ‘আমরা বনাম ওঁরা’ অনুভূতি যদি বেড়ে যায়, সেটাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে চিন্তার বিষয়। ব্যয় কমানোর উপায় সরকারের আয় বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও, ব্যবসায় মন্দা, বেসরকারি বেতন ও মজুরি সেভাবে না বৃদ্ধি পাওয়া এবং চড়া মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের এখন বাড়তি কর দেওয়ার সামর্থ্য নেই। তাই সরকারের সামনে একটি বিকল্প হলো নিজেদের ব্যয় কমিয়ে ফেলা। ১৯৯৩ সালে গঠিত প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন কমিটি (এআরসি) ১৯৯৬ সালের প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সংখ্যা কমানো এবং ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিল। বিএনপি সরকার তাদের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পারেনি। বর্তমান বিএনপি সরকার ওই রকম একটি কমিটি গঠন করে প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করতে পারে। সরকারের বিলাসিতা বাদ দেওয়াও জরুরি। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর কার্যালয়ে দুপুরের খাবার ১৫০ টাকার মধ্যে সারছেন, যা একটি উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ। এছাড়া, অপ্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, প্রকল্প ও ভবন নির্মাণ বন্ধ করা উচিত।