দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্প্রতি ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের পর দলটির ভেতরে এখন এই কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে আলোচনা তুঙ্গে। বিশেষ করে নতুন মহাসচিব কে হবেন এবং দলের নেতৃত্বে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা নিয়ে নেতা-কর্মীদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর কাউন্সিল আয়োজনের বিধান থাকলেও, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এরপর আর তা করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসার পর সপ্তম কাউন্সিলের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর আগে একাধিকবার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, খুব শিগগিরই কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। কাউন্সিলের প্রস্তুতি ও সময়সূচি কাউন্সিলের আগে বিএনপি তাদের তৃণমূল সংগঠনকে গুছিয়ে নিতে আগ্রহী। যেসব জেলায় আংশিক কমিটি রয়েছে, সেগুলোকে পূর্ণাঙ্গ করা হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোতে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হবে এবং যেসব জেলায় বর্তমানে আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে, সেগুলোতে কাউন্সিল আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। দলীয় সূত্র অনুযায়ী, চলতি বছরেই কাউন্সিল করার চিন্তা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে রয়েছে। তবে জেলা কমিটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় কাউন্সিলের সময়সূচি নিয়ে এখনো কিছুটা অনিশ্চয়তা বিদ্যমান। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন যে, জাতীয় কাউন্সিল দ্রুতই অনুষ্ঠিত হবে, তবে এর নির্দিষ্ট দিন-তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নেতৃত্বের পরিবর্তন ও মহাসচিব পদ সপ্তম কাউন্সিলের অন্যতম প্রধান আলোচিত বিষয় হলো নতুন মহাসচিবের নির্বাচন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়ার পর মহাসচিবের পদ ছেড়েছেন। এরপর রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে কাউন্সিলে রিজভীকেই পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হবে কি না, তা নিয়ে দলের ভেতরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। তবে মহাসচিব পদে আরও কয়েকটি নাম আলোচনায় রয়েছে। এদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি অন্যতম। কাউন্সিলে এদের মধ্য থেকে কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, নাকি অন্য কোনো নতুন নেতা সামনে আসবেন, তা নিয়ে দলের ভেতরে আগ্রহ রয়েছে। কাউন্সিলের আগে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের শূন্য পদটিও পূরণ করা হতে পারে। এই পদে যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল ও শহীদ উদ্দীন চৌধুরীর পাশাপাশি ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম বকুলের নামও আলোচনায় রয়েছে। গঠনতন্ত্রের 'সাত ধারা' বিতর্ক প্রায় এক দশক পর হতে যাওয়া এই কাউন্সিলে গঠনতন্ত্র সংশোধনের কোনো প্রস্তাব উঠবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে কাউন্সিলের প্রস্তুতির মধ্যে বিএনপির গঠনতন্ত্রের বহুল আলোচিত সাত নম্বর ধারাটি আবারও আলোচনায় আসতে পারে। এই ধারাটিতে নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির ব্যক্তিকে দলের সদস্যপদ লাভ কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য বিবেচনার বিধান ছিল। ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে গঠনতন্ত্র সংশোধনের সময় এই ধারাটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। তখন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন যে, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলার কারণে ধারাটি বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর বিএনপির সামনে এখন দুটি বড় সাংগঠনিক কাজ—স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন। দলের শীর্ষ নেতাদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার পর ক্ষমতায় এসে বিএনপির সামনে নতুন সাংগঠনিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। তারেক রহমান দল পুনর্গঠনে জোর দিয়ে আসছিলেন। জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে সেই প্রক্রিয়া আরও গতি পেতে পারে।