ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনে বিএনপি
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐতিহাসিক ও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে নতুন সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দেশের নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচনে বিএনপি সারাদেশে একাই ৩ কোটি ৭৪ লাখের বেশি ভোট নিজেদের ঝুলিতে তুলতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে প্রথমবারের মতো সংসদীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী ও প্রধান বিরোধীদলের ভূমিকায় উঠে এসে বড় ধরনের রাজনৈতিক চমক সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জামায়াত নির্বাচনে ২ কোটি ৩৮ লাখের বেশি ভোট অর্জন করে নিজেদের শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থানের জানান দিয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন হিসেবে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ২২ লাখের বেশি ভোট। সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মোট সংগৃহীত ভোটের বিচারে তৃতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে অবস্থান করছেন। তবে বিগত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান বিরোধীদলের আসন দখল করে রাখা জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অভাবনীয় ও মারাত্মক বিপর্যয় দেখা গেছে।
দলভিত্তিক সংগৃহীত ভোট ও প্রাপ্ত পরিসংখ্যানের বিস্তারিত চিত্র
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বিজয়ী দল বিএনপি তাদের ঐতিহ্যবাহী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মোট ২৯০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামিয়েছিল। তারা সর্বমোট ৩ কোটি ৭৪ লাখ ৬৫ হাজার ৩৮টি ভোট পেতে সমর্থ হয়, যা গণনায় আসা মোট প্রদত্ত ভোটের এককভাবে ৪৯.৯৭ শতাংশ। প্রাপ্ত ফলাফলে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান নেওয়া দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নিজস্ব দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ২২৭ জন প্রার্থী দাঁড় করিয়ে ২ কোটি ৩৮ লাখ ১৩ হাজার ৬৩৯টি ভোট সংগ্রহ করে, যা প্রাপ্ত মোট ভোটের প্রায় ৩১.৭৬ শতাংশ। রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মোট ২৭৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী সর্বমোট ৪৩ লাখ ৩৯ হাজার ৮৩৪ ভোট লাভ করেছেন, যা মোট প্রদত্ত কাস্টিং ভোটের ৫.৭৯ শতাংশ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
নবগঠিত এবং আলোচিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সারাদেশ থেকে ২২ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯৫ ভোট অর্জন করেছে, যা মোট ভোটের ৩.০৫ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মোট ২০ লাখ ২৩ হাজার ৯৬৬ ভোট পেয়েছে এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস লাভ করেছে ১৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯২৪ ভোট।
জাতীয় পার্টির চরম রাজনৈতিক বিপর্যয় ও ছোট দলগুলোর পরিসংখ্যান
বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে প্রধান বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করা জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি এবারের নির্বাচনে এক অভূতপূর্ব ও চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। সারাদেশের ১৯৯টি আসন থেকে নিজেদের প্রার্থী দিয়েও দলটি সর্বসাকুল্যে মাত্র ৬ লাখ ৬৯ হাজার ৮২টি ভোট সংগ্রহ করতে পেরেছে, যা শতকরা হিসেবে দাঁড়ায় মাত্র ০.৮৯ শতাংশ। নবগঠিত ও অন্যান্য ক্ষুদ্র দলগুলোর মধ্যে গণঅধিকার পরিষদ প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার এবং এবি পার্টি ২ লাখ ১০ হাজার ভোট পেয়েছে।
নির্বাচনে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ভোটের পরিসংখ্যানে অবস্থান করেছে ১২টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। এর মধ্যে নতুন নিবন্ধিত জনতার দল ৩৭ হাজার ৪০১ ভোট এবং বাসদ (মার্কসবাদী) পেয়েছে ১৩ হাজার ২৩৫ ভোট। তবে বহু নামীদামী ও প্রভাবশালী রাজনীতিকদের দল এই নির্বাচনে আশানুরূপ ফল অর্জনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য পেয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৮৯৯ ভোট, আমজনতার দল ৬ হাজার ২০৯ ভোট এবং ড. কামাল হোসেন প্রতিষ্ঠিত গণফোরাম পেয়েছে ৫ হাজার ৬৬ ভোট। তাছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৫টি দল সারাদেশে ১ হাজার ভোটও সংগ্রহ করতে সমর্থ হয়নি, যার মধ্যে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ও গণফ্রন্ট অন্যতম।
#রাজনীতি #বাংলাদেশ #নির্বাচন #সংবাদ